Saturday, December 17, 2016

কুরবানীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং শিক্ষানিয় বিষয়

প্রকৃত পক্ষে কুরবানীর তিনটি মৌলিক ও মহান উদ্দেশ্য রয়েছে।
এক. আল্লাহর একত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে সারা দুনিয়ার মুসলমান কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে তাঁরই নামে এবং তাঁরই রাসূল প্রদর্শিত পন্থায় কুরবানী করে। এ সবের মাধ্যমে তারা এ কথারই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই, তিনিই সর্ব শ্রেষ্ঠ সার্বভৌমত্বের মালিক কেবল মাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া অন্য কারো বিধান মানা যেতে পারে না। তাঁর দেয়া শরীয়তই সাফল্যের পথ আর তাঁর সন্তুষ্টি বিধানই মুক্তির চাবিকাঠি।
দুই. মহান আল্লাহ তায়ালার মালিকানা স্বীকার করা। অর্থাৎ সমস্ত জগতের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা। তিনিই অনুগ্রহ করে আমাদের জীবন ও ধন সম্পদ দান করেছেন। আমাদের জীবন ও সম্পদের প্রকৃত মালিক তিনিই। এ জীবন ও সম্পদ তিনি আমাদের নিকট আমানত রেখেছেন। এগুলোর ব্যয় ও পরিচালনার ব্যাপারে আমি সেচ্ছাচারী হতে পারিনা। প্রকৃত মালিকের ইচ্ছা ও সন্তুষ্টি অনুযায়ী এগুলোর ব্যয় ও পরিচালনা হবে। তাঁরই ইচ্ছা ও সন্তুষ্টি অনুযায়ী আমার জীবন সম্পদ ব্যয় করার জন্য আমি সদা প্রস্তুত। এ প্রস্তুতির নিদর্শন স্বরূপই তাঁর নামে পশু কুরবানী করছি। পশু যবেহের সাথে সাথে তার গলদেশ থেকে যেভাবে রক্ত প্রবাহিত হয়, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য তাঁর পথে এমনি করেই আমার বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতেও একনিষ্ঠ ভাবে প্রস্তুত।
তিন. আল্লাহর নেয়ামাতের কৃতজ্ঞতা স্বীকার। অর্থাৎ আমার যাবতীয় ধন-সম্পদ আল্লাহরই দেয়া নেয়ামত। এগলো তাঁরই একান্ত অনুগ্রহ। আমার প্রতি তাঁর এ সীমাহীন অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এ সম্পদ আমি তাঁরই নামে কুরবানী করছি। আমি যে তাঁর নিকট সত্যি কৃতজ্ঞ, আমার এ কুরবানী তারই নিদর্শন।
কুরবানীর রূহানিয়াত ও প্রাণ শক্তি
প্রাক ইসলামী যুগে লোক কুরবানী করার পর তার গোশত বাইতুল্লাহর সামনে এনে রেখে দিত। তার রক্ত বাইতুল্লাহর দেয়ালে দেয়ালে মেখে দিত। কিন্তু আল কুরআন ঘোষণা করলো- তোমাদের এ গোশত ও রক্ত কোনটারই প্রয়োজন আল্লাহর নেই। তাঁর কাছে তো কুরবানীর সে আবেগ-অনুভূতি পৌঁছে যা যবেহ করার সময় তোমাদের মনে সঞ্চারিত হয় বা হওয়া উচিত। গোশত ও রক্তের নাম কুরবানী নয়। বরং কুরবানী এ তত্ত্বেরই নাম যে, আমাদের সব কিছুই আল্লাহর জন্যে এবং তাঁর পথেই উৎসর্গ করতে হবে।
উল্লেখ্য যে, কুরবানকারী শুধু মাত্র পশুর গলায়ই ছুরি চালায় না, বরং তার সকল কু-প্রবৃত্তির উপর ছুরি চালিয়ে তাকে নির্মূল করে। এ অনুভূতি ব্যতীত যে কুরবানী করা হয়, তা হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত ইসমাঈল আ. এর সুন্নাত নয়। এটা একটা জাতীয় রসম মাত্র। তাতে গোশতের ছড়াছড়ি হয় বটে, কিন্তু সেই তাকওয়া পাওয়া যায় না যা কুরবানীর প্রাণ শক্তি।
মহান আল্লাহ বলেন
لَنْ يَنَالَ اللهَ لُحُوْمُهَا وَلَا دِمَائُهَا وَلـكِنْ يَّنَالُهُ التَّقْوى مِنْكُمْ-
“ও সব পশুর রক্ত, মাংস আল্লাহর কাছে কিছুতেই পৌঁছে না। বরং তোমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের তাকওয়া তাঁর কাছে পৌঁছে”। (সূরা আল হজ্জ-৩৭)
যে কুরবানীর পেছনে তাকওয়ার আবেগ-অনুভূতি নেই আল্লাহর দৃষ্টিতে সে কুরবানীর কোনই মূল্য নেই। আল্লাহর কাছে সেই আমলই গ্রহীত হয়, যার প্রেরণা দান করে তাকওয়া ।
এ ব্যাপারে ইরশাদ হচ্ছে -
اِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِيْنَ
“আল্লাহ শুধু মুত্তাকীদের আমল কবুল করেন”। (সূরা আল মায়িদ্হ -২৭)
সুতরাং কারো কারো এ প্রশ্ন করার কোন অবকাশ নেই যে, প্রত্যেক বৎসর জাতি শুধু পশু যবেহ করার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করবে এবং তিনদিন গোশত খাবে। এর দ্বারা তো জাতীয় কোন উন্নতির লক্ষণ দেখা যায় না। কারণ, কুরবানী শুধু গোশত ভক্ষণ করার জন্য নয় বরং ইহা শরীয়তের একটি হুকুম, সুন্নাতে ইবরাহীমী কে স্বরণ করে আল্লাহর রাস্তায় জান মাল কুরবানী করার এক শক্তিশালী জযবা পয়দা হয়। তা নাহলে অন্যান্য উম্মতের জন্যে গোশত খাওয়া তো মোটেও জায়িয ছিলনা।
কুরবানী আল্লাহ তায়ালার একটি বিশেষ রহমত ও বরকতের বিধান
১. কুরবানীর সময় পশু কুরবানী করার মাধ্যমে আমাদের পশু সুলভ আচরণ পরিবর্তিত হয়ে সেটা যথার্থ মানব সুলভ আচরণে পরিণত হয়। সুতরাং কুরবানীর বিধানটা মুমিন বান্দার চরিত্র সংশোধনের জন্য আল্লাহ তায়ালার একটি বিশেষ রহমত।
২. ধনী-গরীব, অসহায়, দুস্থ ইত্যাদি নানা রকম মুসলমান এ দুনিয়ায় বসবাস করে থাকে। আর তারা সকলেই গোশত উপভোগ করার আশা করে থাকে। কিন্তু অভাব, অসুবিধা, অবহেলা, ও স্বভাবগত দোষের কারণে তাদের মধ্যে অনেকে গোশত উপভোগ করার সুযোগ পায়না এবং অনেকে সুযোগ করে নেয় না।
কুরবানী আল্লাহ প্রদত্ত এমন একটি অপরিহার্য বিধান যে, এটি পালন করার ফলে বছরে অন্তত একবার সকলেই আল্লাহ পাকের এ বিশেষ নেয়ামতটি উপভোগ করার সুযোগ পায়। এমনকি কুরবানীর গোশত অমুসলিমদেরকে ও দেয়া যাবে বলে শরীয়তে বলা হয়েছে। সুতরাং কুরবানীর বিধান আল্লাহ প্রদত্ত দুনিয়ার সকল মানুষের জন্যই একটি বিশেষ রহমতের বিধান।
৩. প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পশু কুরবানী করা সত্বেও পরবর্তী এক বছরের মধ্যে আবার কুরবানী দেয়ার মতো পশুতে দুনিয়া ভরে উঠে। আবহমান কাল থেকেই এরকম হয়ে আসছে। এর কারণ হলো কুরবানীর পশু গুলোর প্রতি উপযুক্ত যতœ নেয়া হয়। এ পশু গুলোর উপযুক্ত তদবীর করার ফলে বরকত দেখা যায়। আর যে সব পশুর তদবীর করা হয় না তার বরকত ও দেখা যায় না।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় বিড়াল ও কুকুর একবার কয়েকটি বাচ্চা প্রসব করে অথচ বিড়াল ও কুকুরের সংখ্যা দুনিয়ায় খুব বেশী দেখা যায় না।
অপর পক্ষে গরু একবার একটা বাচ্চা দেয়, তা সত্বেও দুনিয়ায় বিপুল সংখ্যক গরু দেখা যায়। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক গরু কুরবানী দেয়া সত্বেও তা বিলীন হয়ে যায় না। বরকতের জন্যেই এরূপ হয়ে থাকে। আর এটা আল্লাহর একটি বিশেষ রহমত ছাড়া আর কিছুই না।
কুরবানীর শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ
১. প্রকৃত মুসলমান হতে হলে আল্লাহর হুকুম যেরকমই হোক না কেন তা বিনা বাক্যে মেনে নিতে হবে। তার পরিণাম ভাল কি মন্দ তা চিন্তাও করা যাবে না, কারণ, তা আল্লাহর হুকুম। আর আল্লাহর হুকুম মেনে নিলে তার ফল কোন দিন ও মন্দ হয় না।
২. আল্লাহর হুকুম সহজই হোক আর কঠিনই হোক তা মেনে চলার ব্যাপারে মনের ঝোঁক প্রবণতা একই প্রকার থাকতে হবে। কারণ, মানব জীবনের চরম লক্ষ্যই হচ্ছে আল্লাহর যাবতীয় হুকুম আহকাম মেনে চলে সর্বদাই আল্লাহকে রাজী খুশী রাখা। কাজেই মুসলমানদের মনের ঝোঁক সর্বদাই এমন থাকতে হবে যে, আল্লাহর হুকুম মানতে গিয়ে বাঁচলে ও জীবন সফল, মরলেও জীবন সার্থক।
৩. আল্লাহর হুকুম মানার ব্যপারে পার্থিব কোন লাভ-লোকসান, কোন মায়া-মুহাব্বত, কামনা-বাসনা বা যে কোন কিছুর প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারবে না। এটাই প্রকৃত মৃসলমানী।
যেমন হযরত ইবরাহীম আ. রাজী হয়েছেন
১. আগুনের কুন্ডে নিক্ষিপ্ত হতে।
২. সদ্যজাত শিশু সন্তানকে তার মা সহ বিজন মরুভূমির মধ্যে রেখে আসতে।
৩. নিজ হাতে নিজের সন্তানকে কুরবানী করতে, কোন বাঁধাই প্রতিবন্ধক হতে পারেনি।
৪. বছরে মাত্র একবারই আমরা কুরবানী দেই। কিন্তু এর ফল সুদূরপ্রসারী। কুরবানী আমাদের জন্য ত্যাগ ও তিতিক্ষার একটি ট্রেনিং এর ব্যবস্থা ও বটে।
উল্লেখ্য যে, ত্যাগ ও কুরবানী ছাড়া কোন ভাল কাজই সম্পন্ন হতে পারে না। চাই আল্লাহর হক হউক আর বান্দার হকই হউক।
৫. আমাদের দ্বীন দুনিয়ায় উন্নতি ও অগ্রগতি আমাদের সালফে সালেহীনদের কুরবানীর ফসল, যা আমরা ভোগ করতেছি। তাই পরবর্তী প্রজন্মের কল্যাণের জন্যে আমাদেরকে সেই ভাবে কুরবানী ও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।
কুরবানী মুসলিম উম্মাহ্র ঐক্যের প্রতীক
সারা দুনিয়ার মুসলমান ঈদুল আয্হার দিন কুরবানী করার মাধ্যমে এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, তারা এক উম্মাহর অন্তর্ভূক্ত। কেবলমাত্র আল্লাহর নামে পশু কুরবানী করে তারা এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ই তাদের মালিক। তিনি তাদের মা’বুদ, তিনি তাদের রব। তাঁর আইন ছাড়া আর কারো বিধান তারা মানে না।
ইসলামী শরীয়াতের বিধান অনুযায়ী কুরবানী করে তারা এ কথা প্রমাণ করে যে, ইসলামই তাদের জীবনাদর্শ, এটাই তাদের চলার পথ। এটাই হচ্ছে তাদের জীবন বিধান। তারা ইসলাম ছাড়া অন্য কোন পথ ও মত মানতে রাজী নয়। মুহাম্মদ সা. এর সুন্নাতের ভিত্তিতে কুরবানী করে তারা এ কাথারই সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি তাদের একমাত্র রাহবর ও পথ প্রদর্শক, তাঁকে ছাড়া কারো অনুসরণ ও অনুকরণ করতে তারা রাজী নয়। মোট কথা কুরবানী মুসলিম উম্মাহ্র এক শক্তিশালী ঐক্যের প্রতীক।
কুরবানীর দাবী ও আহবান এবং মুসলিম উম্মাহর করণীয়
বছর পরিক্রমায় কুরবানীর ঈদ এসে হাজির হয় মুসলিম জাতিকে হযরত ইবরাহীম আ. এর ত্যাগের চেতনায় নতুন ভাবে উজ্জীবিত করতে।
কুরবানীর সাথে জড়িত রয়েছে হযরত ইবরাহীম আ. এর তাওহীদবাদী জীবন ও একটি জাতি গঠনের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতহাস।
হযরত ইবরাহীম আ. কে আল্লাহ পাক এ শাশ্বত পয়গাম, চিরন্তন ইমামত ও নেতৃত্বের সম্মান দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। এক নতুন জগতের বিনির্মাণের মহান উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে প্রস্তুত করেছিলেন।
তিনি তদানীন্তন সমাজের বিশ্বাস, ধর্মীয় আবেগ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মহাবিদ্রোহ সূচনা করলেন। যার ফলে তাঁকে কঠিন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন:
১. নমরূদ কর্তৃক প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়া।
২. তাওহীদের হেফাজতের প্রয়োজনে চিরদিনের জন্য প্রিয় জন্ম ভূমি ত্যাগ করা।
৩. আল্লাহর নির্দেশে জনশূণ্য মরু-মক্কায় স্ত্রী হাজেরা ও কোলের শিশু ইসমাঈল কে রেখে যাওয়া ইত্যাদি ছিল বিশ্ব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম জাতি গঠনের যোগ্যতা অর্জনের বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা।
৪. হযরত ইবরাহীম আ. এর জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা, প্রেমের অগ্নি পরীক্ষা এলো চুড়ান্ত পর্যায়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ দেখতে চাইলেন তাঁর খলীলের ভালবাসা তাঁর প্রতি কতটা একনিষ্ঠ ও নির্ভেজাল। তাই নির্দেশ এলো কলিজার টুকরা ইসমাঈলকে কুরবানী করে দাও। নির্দেশ পাওয়া মাত্র তিনি প্রস্তুত হলেন আল্লাহর ইচ্ছা পূর্ণ করার জন্য। পুত্র ইসমাঈলকে তিনি জানিয়ে দিলেন আল্লাহর ইচ্ছার কথা। বালক ইসমাঈল আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজেকে কুরবানীর জন্য পেশ করে দিলেন। আল্লাহর নামে কুরবানী হওয়া, আল্লাহর নির্দেশে প্রিয় সন্তানের কুরবানী দেয়া, উভয়ই ছিল আল্লাহর প্রেমের উজ্জল ¯িœগ্ধতায় শুভ্র সমুজ্জল। শয়তানের প্ররোচনায় পার্থীব মায়া-মমতা উপেক্ষা করে প্রত্যয় দীপ্ত পদক্ষেপে তাঁরা এগিয়ে গেলেন তাদের লক্ষ্যে। মিনা প্রান্তরে তপ্ত বালুতে পরম যতেœ প্রিয় পুত্রকে শুইয়ে দিলেন পিতা ইবরাহীম আ.। পূর্ণ শক্তিতে তীক্ষè শানিত ছুরি চালালেন পুত্রের গলায়। আল্লাহর মহাপরীক্ষা সফল হলো, ইবরাহীম আ. উত্তীর্ণ হলেন।
আল্লাহর প্রেমের এমন ঘটনাকে চির অমর করার উদ্দেশ্যে,
এমন কুরবানীর প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য আল্লাহ প্রতি বছর ঈদুল আয্হার দিনগুলোতে সকল মুসলমানদের জন্য এই কুরবানীর বিধান কে এক উত্তম ইবাদত হিসেবে ওয়াজিব করে দিলেন।
ঈদুল আয্হার উৎসব ভুরিভোজনের কোন উৎসব নয়! বরং খোদাদ্রোহী তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রথম পাঠ-প্রথম সবক। এ পাঠকে মুসলমান জাতির জন্য ওয়াজিব তো এজন্যই করে দেয়া হয়েছে, যেন তারা এই ঈদ উৎসবের মাধ্যমে আল্লাহর রাহে প্রাণ দেয়ার উৎসাহ পায়, সাহস অর্জন করে। হযরত ইবরাহীম ও হযরত ইসমাঈলের এ অভূতপূর্ব দৃশ্য বারবার ভেসে উঠে পবিত্র ঈদে মুসলমানদের মানস পটে।
কুরবানীর আগমন ঘটে মুসলমান জাতির অন্তরে এ জীবন অনুভূতি জাগ্রত করার জন্য যে, ঈমান ও তাওহীদের পথে তাদের এ জীবন হচ্ছে দুনিয়ার সকল অপশক্তি ও শয়তানী চক্রের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম ও সংঘাতের জীবন।
এই কুরবানী আহবান জানায় মুসলমান জাতিকে শক্তিশালী ঈমান, নির্ভেজাল প্রেম এবং নজীরবিহীন ত্যাগ ও কুরবানীর আদর্শ অনুসরনের মাধ্যমে অন্যায় , অসত্য ও খোদাদ্রোহী তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণায়।
আল্লাহর কাছে কুরবানীর পশুর রক্ত মাংস কিছুই পৌঁছেনা। বরং আল্লাহর কাছে পৌঁছে বান্দার তাকওয়া, আন্তরিকতা ও একাগ্রতা। যেহেতু আজ আমাদের অন্তরে আল্লাহর প্রতি মহব্বত অনুপস্থিত, নিয়তের প্রবিত্রতা কলুষিত তাই কুরবানীর রক্ত শুধু জমিনই লাল করছে, আমাদের হৃদয়কে আল্লাহর মহব্বতে রঞ্জিত করছেনা। সে জন্য আমাদের কুরবানী আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে, যা আমাদেরকে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার হিম্মত জোগাচ্ছেনা।
জাতির সত্যিকার কল্যাণ করতে হলে ত্যাগ করতে হবে হযরত ইবরাহীমের আ. মতো। আজ আমরা ইবরাহীমী কুরবানীকে ভূলে গেছি। আজ তাই গোটা বিশ্বে মুসলমানদের করুণ দশা। আমাদের কুরবানীর অবস্থা দেখে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বলেছিলেন,
“ঈদের নামায আমাদের শিখিয়েছে সত্যিকার কুরবানী করলেই মিলবে নিত্যানন্দ।
আমরা গরু-ছাগল কুরবানী করে খোদাকে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করছি। তাতে করে আমরা নিজেদেরকেই ফাঁকি দিচ্ছি। আমাদের মনের ভিতরে যে সব পাপ, অন্যায় স্বার্থপরতা ও কুসংস্কারের গরু-ছাগল যা আমাদের সৎবৃত্তির ঘাস খেয়ে আমাদের মনকে মরুভূমি করে ফেলেছে, আসলে কুরবানী করতে হবে সেই সব গরু-ছাগলের।
হযরত ইবরাহীম আ. নিজের প্রাণতুল্য পুত্রকে কুরবানী করে দিলেন বলেই তিনি নিত্যানন্দের অধিকারী হয়েছিলেন। আমরা তা করিনি বলেই আমরা কুরবানী শেষ করে চিড়িয়াখানায় যাই তামাসা দেখতে। আমি বলি ঈদ করে যারা চিড়িয়াখানায় যায়, তারা চিড়িয়াখানায় থেকে যায় না কেন?”
মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ জনতাকে নজরুলের ভাষায় চিড়িয়াখানায় আশ্রয় নেবার সময় এসেছে। কারণ, আজো আমরা কুরবানীর পশুর গলায় ছুির চালাতে গিয়ে মুখে উচ্চারণ করি -
اِنَّ صَلوتِىْ وَ نُسُكِىْ وَمَحْيَاىَ وَمَمَاتِىْ للهِ رَبِّ الْعلَمِيْنَ
“আমার সব প্রার্থণা নামায, রোযা, তাপস্য, জীবন-মরণ সব কিছু বিশ্বের একমাত্র পরম প্রভূ আল্লাহর পবিত্র নামে নিবেদিত”।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো অন্তরে এর কোন অনুভূতিই নেই। যখন মুসলমানদের কুরবানীতে হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত ইসমাঈল আ. এর ত্যাগের অনুভূতি বিদ্যমান ছিল তখন দেখেছি ওহুদের যুদ্ধে, বদরের ময়দানে, খায়বরের জঙ্গে মুসলমানদের বিজয়। দেখেছি হযরত ওমর ফারুক রা. এর বিশ্ব বিজয়ী বাহিনীকে অগ্রসৈনিক রূপে, দেখেছি দূর আফ্রিকায় মুসা, তারিকের, মিশরের পিরামিডের পার্শ্বে, ইরান মুলুকের আলবোর্জের জিব্রাল্টারের উত্তুঙ্গ জলরাশির মধ্যে নাঙ্গা শমশের হাতে মুসলিম সেনাদেরকে ঝাঁপিয়ে পড়তে। দেখেছি ক্রুসেডের রণে, জেহাদের জঙ্গে সুলতান সালাউদ্দীনের বিজয়।
আজ আল্লাহর রাহে কুরবানীর চেতনায় ইবরাহীমী জযবা নেই বিধায় গোটা বিশ্বব্যাপী মুসলমান চরম ভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আজ মা হাজেরার অনুপ্রেরণায় শত শত মা তাদের কচি-কচি সন্তানকে শুধু মাত্র ঈমানী জযবায় শহীদী ঈদগাহে পাঠাচ্ছেন। শত শত নারী-পুরুষ জীবন বিলাচ্ছে তাদের ঈমান, ইজ্জত রক্ষা করতে। আর বিচ্ছিন্ন ভাবে নয়, শক্তিমান দানবদের উৎপাত থামাতে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে এক হয়ে জান-মালের কুরবানীর জন্য এগিয়ে আসতে হবে। শুধু মাত্র গরু কুরবানী করেই আল্লাহ কে ফাঁকি দিলে গোটা জাতি ফাঁকির অতল গর্ভে হারিয়ে যাবে।
মুসলামান জাতিকে স্মরণ করা প্রয়োজন রাসূল সা. ও সাহাবাদের কুরবানীর ইতিহাস। তাঁদের কুরবানীর অন্যতম ইতিহাস হোদায়বিয়ার প্রান্তরের কুরবানী। হোদায়বিয়ার প্রান্তরে একদিকে রাসূল সা. এর সাথে নিয়ে আসা কুরবানীর পশুগুলোকে কুরবানী দিলেন, অন্য দিকে শত্রুদেশে এসে একদল মুসলামানের সত্যের জন্য আতœদানের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। এই দ্বিবিধ কুরবানীর ফলে মুসলমানদের জন্য আল্লাহ কবুল করলেন “ফতহে মুবীন” সুস্পষ্ট বিজয়।
কুরবানীর শিক্ষাকে সার্থক করার জন্য আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন গোটা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ কে সম্মিলিত হওয়া, সংঘবদ্ধ হওয়া। যে উখ্ওয়াত-সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, যে একতা ছিল মুসলিমের আদর্শ যার জোরে মুসলিম জাতি এক শতাব্দীর মধ্যে পৃথিবী জয় করেছিল, আজ আমাদের সে একতা নেই তারা হিংসায়, ঈর্ষায়, কলহে ঐক্যহীন বিচ্ছিন্ন, এই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ গ্রহণ করেছে ইসলামের শত্রুরা।
মুসলমানদের বিজয়ের পেছনে ছিল ঐক্যবদ্ধতা, মৃত্যু ভয়হীনতা ও আল্লাহর রাহে জানমালের কুরবানী। এসব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে মুসলমানেরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
রাসূলুল্লাহ সা. মুসলমানদেরকে সাবধান করে বলেছেন : শিঘ্রই আমার উম্মতের উপর এমন একটি দু:সময় আসবে যখন দুনিয়ায় বিভিন্ন জাতি তাদের দিকে এমন ভাবে ধাবিত হবে যেমন ধাবিত হয় ক্ষুধার্ত মানুষ খাদ্যের দিকে। সাহাবাদের কেউ একজন জিজ্ঞেস করলেন, তখন আমরা সংখ্যায় এতোই কম থাকবো? (যে অন্যান্য জাতিগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদেরকে গিলে ফেলার জন্য ছুটে আসবে?) রাসূলুল্লাহ সা. বললেন: না, সেদিন তোমাদের সংখ্যা কম হবেনা বরং তোমরা সংখ্যায় অধিক হবে। কিন্তু তোমরা হবে বন্যার পানির ফেনার সমতুল্য। অবশ্যই আল্লাহ সে সময় তোমাদের শত্রুর অন্তর থেকে তোমাদের ভীতি দূর করে দেবেন এবং তোমাদের মনে তাদের ভয় সৃষ্টি করে দেবেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন : হুজুর! আমাদের মনে এ দূর্বলতা ও ভীতি দেখা দেয়ার কারণ কি হবে?
রাসূলুল্লাহ সা. বললেন -
حُبُّ الدُّنْيَا وَكَرَا هِيَةُ الْمَوْتُ দুনিয়া প্রীতি ও মৃত্যুভীতি। অর্থাৎ সেদিন তোমরা দুনিয়াকে ভালোবাসবে, দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরবে এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ পরিত্যাগ করবে। { সুনানে আবু দাউদ, সূত্র: হযরত সাওবান রা. হতে বর্ণিত।}
রাসূলুল্লাহ সা. এর হাদীস আজ সত্যে পরিণত হয়েছে
আজ গোটা মুসলিম বিশ্বকে জয় করে নিচ্ছে ইহুদী,নাসারা ও মুশরিক ঐক্যবদ্ধ শক্তি। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে মুসলমানদের ঈদগাহে আসতে হবে শুধু কুরবানীর পশু নিয়ে নয়, বরং রাসূলের আদর্শে আদর্শিত হয়ে নিজেদের জান-মাল কে আল্লাহর রাহে কুরবানীর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে।
বর্তমান বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কাছে কুরবানী আহবান জানায় শক্তিশালী ঈমান, নির্ভেজাল প্রেম এবং নজীর বিহীন ত্যাগ ও কুরবানীর ইবরাহীমী আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে বদ্ধমুল কুসংস্কার, অসত্য কুফরীও তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করার। কুরবানীর এ আহবানে সাড়া দিতে পারলেই এক নতুন সাজে সজ্জিত এবং নতুন প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠবে তাওহীদবাদী গোট মুসলিম উম্মাহ্। বিজয় মুসলমানদেরই হবে ইন্শাআল্লাহ।
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন -
وَ لَا تَهِنُوْا وَلَا تَحْزَنُوْا وَ اَنْتُمُ الْاَعْلَوْنَ اِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِيْنَ-
“আর তোমরা নিরাশ হয়োনা এবং দুঃখ করোনা। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই বিজয়ী হবে। { সূরা আলে ইমরান -১৩৯।}
মহান আল্লাহ আরো বলেন -
وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِيْنَ
“মুমিনদের সাহায্য করা আল্লাহর জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে যায়”।{ সূরা আর রূম -৪৭।}
মহান আল্লাহ আরো ঘোষণা করেন -
اَلَا اِنَّ نَصْرَ اللهِ قَرِيْبٌ-
“ সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটেই”। { সূরা আল বাকারাহ -২১৪।}
জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বলেছিলেন -
“ভেঙ্গেছে দুয়ার, জেগেছে জোয়ার, রেঙেছে পূর্বাচল,
খুলে গেছে দেখ দুর্গতি ভরা দুর্গের অর্গল।
মৃত্যুর মাঝে অমৃত যিনি এনেছে তার বাণী,
পেয়েছি তাহার পরমাশ্রয়, আর ভয় নাহি মানি।
সকল ভয়ের মাঝে রাজে যার পরম অভয় কোল,
সেই কোলে যেতে আয়রে কে দিবি মরণ দোলাতে দোল।”
আসুন! আমরা মুসলিম উম্মাহ্ ঈদুল আয্হায় কুরবানীর পবিত্র উৎসবে সেই মরণ দোলাতে দোল দিয়ে বিশ্বকে বাঁচাই ।

শেয়ার করুন

0 Comments:

একটা ভাল মন্তব্য আমাদের আরও ভাল কিছু লিখার অনুপেরনা যাগাই!