Showing posts with label বিষয় ভিত্তিক মাসয়ালা. Show all posts
Showing posts with label বিষয় ভিত্তিক মাসয়ালা. Show all posts

Friday, April 10, 2020

দেশের বর্তমান অবস্থায় মসজিদ এবং মসজিদ ছাড়া অন্যত্র জুমা আদায়ের হুকুম কী?

দেশের বর্তমান অবস্থায় মসজিদ এবং মসজিদ ছাড়া অন্যত্র জুমা আদায়ের হুকুম কী?


প্রশ্ন: দেশের বর্তমান অবস্থায় মসজিদ এবং মসজিদ ছাড়া অন্যত্র জুমা আদায়ের হুকুম কী? 
সমাধান: যে সমস্ত গ্রাম এবং শহরে জুমার শর্ত পাওয়া যায়, সে সমস্ত এলাকায় মসজিদে তো নিয়মিত জুমা  চলে আসছে। তবে, সেখানে বর্তমান অবস্থায় সরকার এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে ক‘জনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে নিয়ে সেখানে জুমা আদায় করা হবে। অবশ্য খেয়াল রাখতে হবে যে, জুমা আদায়ের জন্য ইমাম ছাড়া কমপক্ষে তিনজন মুক্তাদী আবশ্যক। বর্তমান অবস্থায় যারা মসজিদে জনসমাগমের নিষেধাজ্ঞার কারণে মসজিদে জুমা আদায় করতে সক্ষম নই, তারা নিজেরা কিছু মানুষ মিলে এলাকাতে নিজের বাড়ির উঠানে অথবা বড় কামরাই জুমার নামাজ আদায় করতে পারবে। অবশ্য খেয়াল রাখতে হবে বড় জমায়েত হওয়ার ক্ষেত্রে যেন প্রশাসন বা সরকার পক্ষ থেকে কোন ধরনের চাপের সৃষ্টি না হয়।আর আশেপাশের লোকদেরকে জানিয়ে দিবে, যেন তারাও জামাতে শুরীক হতে পারে। সুতরাং ইমাম সাহেব মুক্তাদীদেরকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত খুতবা পড়ে সংক্ষিপ্ত কেরাতের সাথে জুমা আদায় করবে।

প্রশ্ন: পাঞ্জেগানা মসজিদে জুমা আদায় করতে পারবে কী?
সমাধান: বর্তমান অবস্থার পূর্বে যেসব পাঞ্জেগানা মসজিদে জুমা হতো না, এমতাবস্থায় সে‘সব মসজিদে জুমা আদায় করতে পারবে।খেয়াল রাখবে, যেন লোকসমাগমের আধিক্যের কারণে প্রসাশনের চাঁপের মুখোমুখি না হতে হয়।

প্রশ্ন: এমন পরিস্থিতে যারা কোনো  কারণে জুমা আদায় করতে পারেনি, তারা কি জোহরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করবে, নাকি আলাদাভাবে?

সমাধান: 
যারা জুম্মা আদায় করতে পারেনি, চাই তা ইমাম-খতিব না থাকার কারণে বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাপের কারণে অথবা নিজের অসুস্থতার কারণে বা জুমার শর্ত না পাওয়া যাওয়ার কারণে, শরীয়তের দৃষ্টিতে এমন ব্যক্তি মাযূর/অপারগ হিসেবে গণ্য হবে। তারা জুম'আর পরিবর্তে একাকী জোহরের নামাজ আদায় করবে।
এরকমভাবে যে শহর অথবা গ্রামে জুমা আদায়ের কোন ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি, কোন ওজরের কারণে,  তারা জোহরের নামাজ একা একা আদায় করবে। জামাতের সাথে নয়। জামাতের সাথে আদায় করা মাকরুহ।

وصورة المعارضة: لان شعار المسلمين في هذا اليوم صلاة الجمعه وقصد المعارضه لهم يودي الى امر عظيم فكانه في صورتها كراهه التحريم. (رد المحتار: كتاب الصلاة، باب الجمعه، الناشر: مكتبه زكريا ديوبند)
لان المامور به في حق من يسكن المصر في هذا الوقت شيئان: ترك الجماعه وشهود الجمعه واصحاب السجن قدروا على احدهما هو ترك الجمعه فياتون بذلك. (المبسوط للسرخسي:2|36. باب الصلاه الجمعة، دار المعرفه بيروت)
ومن لا تجب عليهم الجمعه من اهل القرى والبوادي لهم ان يصلوا الظهر بجماعه يوم الجمعه باذان واقامة. (الفتاوى الخانيه على هامش الهدايا:1|177. كتاب الصلاة، باب صلاة الجمعة) 
قوله في مصر: اما في الحق اهل السواد فغير مكروه لانه لا جمعة عليهم. (حاشيه الطحطاوي على الدر:1|346. مكتبه الاتحاد ديوبند)

(۱)عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ سَمِعَ الْمُنَادِيَ فَلَمْ يَمْنَعْهُ مِنَ اتِّبَاعِهِ، عُذْرٌ» ، قَالُوا: وَمَا الْعُذْرُ؟، قَالَ: «خَوْفٌ أَوْ مَرَضٌ، لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ الصَّلَاةُ الَّتِي صَلَّى». (سنن أبي داؤد:ح:551.)
(۲) وإذا انقطع عن الجماعة لعذر من أعذارها المبيحة للتخلف" وكانت نيته حضورها لولا العذر الحاصل "يحصل له ثوابها" لقوله صلى الله عليه وسلم: "إنما الأعمال بالنيات وإنما لكل امرئ ما نوى"(مراقي الفلاح:163.كراجي)
(۳)أما اذا كان لمنع عدو يخشى دخوله وهو في الصلاه الظاهر وجوب الغلق. 
(حاشيه الطحطاوي على الدر:1|344. مكتبه الاتحاد ديوبند) 

(۴)امدادالفتاوی میںہے:
اذن عام ہونا بھی منجملہ شرائط صحت جمعہ ہے، جس کے معنی یہ ہیں کہ خود نماز پڑھنے والے کو روکنا وہاں مقصود نہ ہو۔ باقی اگر روک ٹوک کسی اور ضرورت سے ہو تو اذن عام میں مخل نہیں۔ (امداد الفتاوی:۱؎۶۱۴۔ مطبوعہ مکتبہ زکریا دیوبند)
(۵)امداد الاحکام میں ہے:
اگر چھاؤنی یا قلعہ میں جمعہ ادا کیا جائے تو جائز ہےگو چھاؤنی اور قلعے میں دوسرے لوگ نہ آ سکتے ہوں کیونکہ مقصود نماز سے روکنا نہیں ہے بلکہ انتظام مقصود ہے۔ (امدادالاحکام:۱؎۷۵۱۔ مطبوعہ مکتبہ دارالعلوم کراچی)
জুমার নামায সংক্রান্ত জরুর‌ী কিছু মাসআলা

জুমার নামায সংক্রান্ত জরুর‌ী কিছু মাসআলা

* যেসব মসজিদে জুমার নামায অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বর্তমান অবস্থায়ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সংখ্যাক (১০জন) লোকজন মিলে জুমার নামায আদায় করবে।

* পাড়া-মহল্লার যে সকল লোক মসজিদে জুমার নামায আদায়  করতে পারবে না, তারা নিজেদের বাড়ির সামনে বৈঠকখানা কিংবা ঘরের বাহিরের বারান্দায় অন্য লোকদের অংশগ্রহণের অনুমতি সাপেক্ষে জুমার নামায আদায় করতে পারবে। (তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন ধরনের বাধা-নিষেধ না থাকতে হবে) অন্যান্য লোকদের অংশগ্রহণের অনুমতির অর্থ আশ-পাশের মানুষদেরকে অবগত করবে যে, এখানে জুমার জন্য কেউ আসতে চাইলে আসতে পারবে। 

* যে‌হেতু জনস্বার্থে সরকারের পক্ষ থেকে পাঁচ জনের অধিক ব্যক্তির সমাগম নিষিদ্ধ করা হয়ে‌ছে, তাহলে তারাও কয়েকজন মিলে জুমার নামায আদায় করবে। তবে ইমাম ব্যতীত নুন্যতম তিনজন বালেগ পুরুষ মুকতাদি হতে হবে। তাদেরকে নিয়ে ইমাম সাহেব সংক্ষিপ্ত খুতবা ও সংক্ষিপ্ত কেরাতের মাধ্যমে জুমার নামায আদায় করবে। 

* যে সকলস্থানে কয়েকজন মিলেও জুমার নামাযের ব্যবস্থা করা না যায়, সেখানে তারা একাকি যোহরের নামায আদায় করবে। তাতে তাদেরকে অপারগ মনে করা হবে। জুমা ছেড়ে দেয়ার কারণে গুনাহগার হবে না।
শ‌বে বরা‌তেও যারা হতভাগা  (‌শেষ পর্ব) মাওলানা সাঈদ অাহমদ (দা.বা.)

শ‌বে বরা‌তেও যারা হতভাগা (‌শেষ পর্ব) মাওলানা সাঈদ অাহমদ (দা.বা.)



শবে বরাত সংক্রান্ত যতগুলো বর্ণনা পাওয়া যায়, তা থেকে সুস্পষ্টভাবে একথা নিশ্চয় প্রমাণিত হয় যে, এ রাতে আল্লাহ পাকের রহমত ও মাগফিরাতের দ্বার ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হয়। ফলে সর্বস্তরের মুসলমান ক্ষমাপ্রাপ্ত হন। কিন্তু কয়েক শ্রেণীর হতভাগা ও কপাল পোড়া এমন রয়েছে, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা রহমতপূর্ণ রজনীতেও ক্ষমা করবেন না, যতক্ষণ না তারা নিজ কৃতকর্ম থেকে খালেস নিয়তে তাওবা করে ফিরে আসবে। এমন লোকের তালিকা নিম্নে প্রদত্ত হলো :
১। মুশরিক ২। হিংসুক ৩। অন্যায়ভাবে হত্যাকারী-খুনি ৪। যাদুকর-গণক ৫। বাদ্য বাজনাকারী ৬। ব্যভিচারিনী।
 
>> শবে বরাত ও শাবান মাসের রোজা<<

এখানে দু’টি বিষয়। একটি হচ্ছে শবে বরাতের পরের দিন রোজা রাখা। আরেকটি হল শাবান মাসে রোজা রাখা। দ্বিতীয় বিষয় সম্পর্কে সহীহ হাদীসে এসেছে, হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, 
مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ  اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ؛ إِلَّا رَمَضَانَ،
وَمَا رَأَيْتُهُ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ.
"রাসূল সা. রমযানের পর সবচেয়ে বেশি শাবান মাসে রোজা রাখতেন। 
অন্য হাদীসে এর কারণ বর্ণিত হয়েছে।"
যেমন হযরত উসামা রা. বলেন,
قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ! لَمْ أَرَكَ تَصُومُ شَهْرًا مِنْ الشُّهُورِ مَا تَصُومُ مِنْ شَعْبَانَ؟ قَالَ: ذَلِكَ شَهْرٌ يَغْفُلُ النَّاسُ عَنْهُ بَيْنَ رَجَب وَرَمَضَانَ، وَهُوَ شَهْرٌ تُرْفَعُ فِيهِ الْأَعْمَالُ إِلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ، فَأُحِبُّ أَنْ يُرْفَعَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ. 
أخرجه أحمد (২১৭৫৩)، والنسائي (২৩৫৭)، وحسنه الضياء في المختارة (১৩১৯) 
"আমি রাসূল সা, থেকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি অন্য কোন মাসে (রমযান ছাড়া) এত বেশি রোজা রাখেন না, যে পরিমাণ রোজা শাবান মাসে রাখেন? তিনি বললেন, এটি (শাবান) রজব ও রমজানের মাঝে এমন একটি মাস, যে মাসে লোকেরা (আমল) থেকে গাফেল থাকে। অথচ এ মাসে বান্দার আমলসমূহ আল্লাহ তাআলার কাছে পেশ করা হয়। আর আমি একথা পছন্দ করি যে, আমি রোযাদার থাকাবস্থায় আমার আমল পেশ করা হোক।"
সুতরাং এ থেকে প্রমাণিত হয়, শাবান মাসে বেশি বেশি রোযা রাখা চাই এবং শাবানের ২৮-৩০ তারিখ ব্যতীত যে কোন দিন রোজা রাখা উত্তম। 

আর প্রথম বিষয় তথা শবে বরাতের পরের দিন রোজা রাখা সম্পর্কে “সুনানে ইবনে মাজাহ”য় বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ عَلِيّ  قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ : إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا نَهَارَهَا؛ فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَقُولُ: أَلَا مِنْ مُسْتَغْفِرٍ لِي فَأَغْفِرَ لَهُ،  أَلَا مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ،  أَلَا مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ، أَلَا كَذَا أَلَا كَذَا حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ.
"হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুলল্লাহ সা. বলেছেন, পনের শাবানের রাত (শবে বরাত) যখন আসে, তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও। আর দিনের বেলা (পরের দিন) রোজা রাখ। কেননা এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হন এবং বলেন, কোন ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোন রিযিকপ্রার্থী? আমি তাকে রিযিক দিব। কে আছ মুসিবতগ্রস্ত? আমি তাকে মুসিবত থেকে মুক্তি দিব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রয়োজনের কথা বলে তাদেরকে ডাকতে থাকেন।"

উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম যুরকানী রাহ. (মৃ. ১১২২ হি.) বলেন
"فقوموا ليلها" أي: أحيوه بالعبادة وانصبوا أقدامكم لله قانتين، "وصوموا نهارها" استحبابا فيهما. (شرح الزرقاني على المواهب اللدنية بالمنح المحمدية ১০/৫৬১).
অর্থাৎ অর্ধ শাবানের রাতে ভালভাবে ইবাদত করা ও পরের দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব।
(সুনানে ইবনে মাজা হাদীস নং ১৩৮৮)

>> শবে বরাতে বিদআত ও কুসংস্কার<<

১। আতশবাজী ২। মসজিদ-মাজার আলোকসজ্জা ৩। হালুয়া-রুটি ও মিষ্টি-বিরিয়ানী বিতরণ

‌লি‌খে‌ছেন
মাওলানা সাঈদ অাহমদ (দা.বা.)
উস্তাদ, দারুল উলূম হাটহাজারী।

Wednesday, April 8, 2020

চার মাযহা‌বের ইমামগণের দৃষ্টিতে শবে বরাতের আমল | মাওলানা সাঈদ আহমদ (দা.বা.) (পর্ব : পাঁচ)

চার মাযহা‌বের ইমামগণের দৃষ্টিতে শবে বরাতের আমল | মাওলানা সাঈদ আহমদ (দা.বা.) (পর্ব : পাঁচ)



'আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যা আল-কুয়েতিয়্যা' নামক ৪৫ খণ্ড বিশিষ্ট সুবিশাল গ্রন্থের একস্থানে রয়েছে :
ذهب جمهور الفقهاء من الحنفية والشافعية والحنابلة إلى ندب إحياء ليلة النصف من شعبان
"শবে বরাতে রাত্রি জাগরণ করা (ইবাদত করা) অধিকাংশ হানাফী, শা‌ফেয়ী ও হাম্বালী ফকীহ ও মুফতী সাহেবের মতে মুস্তাহাব।"
(আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যা আল-কুয়েতিয়্যা ২/২৩৫)

>>> হানাফী মাযহাব<<<
* আল্লামা ইবনে নুজাইম মিসরী হানাফী রাহ. (মৃ. ৯৭০ হি.) বলেন :
ومن المندوبات: إحياء ليالي العشر من رمضان, وليلتي العيدين، وليالي عشر ذي الحجة، وليلة النصف من شعبان، كما وردت به الأحاديث وذكرها في الترغيب والترهيب مفصلة
"রমযানের শেষ দশ রাতে, দুই ঈদের রাতে, জিলহজের প্রথম দশ রাতে ও অর্ধ শাবানের রাতে (শবে বরাতে) জাগ্রত থেকে ইবাদত করা মুস্তাহাব।"

(অাল বাহরুক রা‌য়েক, ইব‌নে নুজাইম ২/৯২-৯৩)

* এভাবে ফিকহে হানাফীর ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আলী আল-হাসকাফী (মৃ. ১০৮৮ হি.) 'দুররুল মুখতার' গ্রন্থে, আল্লামা হাসান ইবনে আম্মার আশ-শারাম্বুলালী হানাফী (মৃ. ১০৬৯ হি.) ‘মারাকীল ফালাহ’তে ও শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (মৃ. ১০৫২ হি.) ‘মা ছাবাতা বিস-সুন্নাহ’ কিতাবে এই রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করাকে মুস্তাহাব উল্লেখ করেছেন। 
 
(দুররুল মুখতার মাঅা রদ্দুল মুহতারর ২/৪৬৯)

* নিকট অতীতের প্রখ্যাত মুহাক্কিক আল্লামা আব্দুল হাই লখনভী রাহ. (মৃ. ১৩০৪ হি.) ‘আল-আসারুল মারফু’আহ’ গ্রন্থে লিখেন
لا كلام في استحباب إحياء ليلة البراءة بما شاء من العبادات، وبأداء التطوعات فيها كيف شاء ... وفي الباب أحاديث أخر أخرجها البيهقي وغيره على ما بسطها ابن حجر المكي في "الإيضاح والبيان" دالّةً على أن النبي  أكثر في تلك الليلة من العبادة والدعاء، وزار القبور ودعا للأموات. فيعلم بمجموع الأحاديث القولية والفعلية استحباب إكثار العبادة فيها، فالرجل مخير بين الصلاة وبين غيرها من العبادات، فإن اختار الصلاة فكمية أعداد الركعات وكيفيتها مفوضة إليه، ما لم يأت بما منعه الشارع صراحة أو إشارة. 
অর্থাৎ “শবে বরাতে জাগ্রত থেকে যে কোন নফল ইবাদতে লিপ্ত থাকা    মুস্তাহাব, এতে কোনো মতানৈক্য নেই। অতঃপর এ সম্পর্কে কিছু হাদীস দলীল স্বরূপ পেশ করে বলেন,এসব হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূল এ রাতে অধিক পরিমাণে ইবাদত ও দু’আ করতেন। কাজেই এসমস্ত   (قولية وفعلية) হাদীস থেকে সমষ্টিগতভাবে এ কথা বুঝা যায়, এ রাতে অধিক পরিমাণে ইবাদত করা মুস্তাহাব। আর ইবাদতের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের জন্য ব্যক্তি স্বাধীনতা থাকবে। চাই সে যে পরিমাণ ইচ্ছা নামায আদায় করুক বা অন্য কোনো ইবাদতে মশগুল থাকুক। 

(অাল-অাসারুল মারফুঅা ফিল অাখবা‌রিল মাওযুঅা ৮১-৮২)

     >>>>মালিকী মাযহাব<<< 

* আল্লামা ইবনুল হাজ মালিকী রাহ. (মৃ. ৭৩৭) ‘আল মাদখাল’ এ লিখেন 
فهذه الليلة وإن لم تكن ليلة القدر فلها فضل عظيم وخير جسيم, وكان السلف - رضي الله عنهم - يعظمونها ويشمرون لها قبل إتيانها، فما تأتيهم إلا وهم متأهبون للقائها، والقيام بحرمتها على ما قد علم من احترامهم للشعائر على ما تقدم ذكره، هذا هو التعظيم الشرعي لهذه الليلة.
অর্থাৎ “শবে বরাত যদিও শবে কদরের মত ফযীলতপূর্ণ নয়, তবুও এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। সালাফ তথা পূর্ববর্তীগণ রাতটির যথেষ্ট মর্যাদা দিতেন এবং এর আগমনের পূর্ব থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। রাতটির আগমন ঘটলে তাকে বরণ করে যথাযথ মর্যাদা দিতেন।”
(অাল মাদখাল ইবনুল হাজ ১/২৯৯)

      >>>>শাফেয়ী মাযহাব<<<<

* ইমাম শাফিয়ী রাহ. (মৃ. ২০৪ হি.) তাঁর ‘আল উম্ম’ কিতাবে লিখেন- بلغنا أنه كان يقال: إن الدعاء يستجاب في خمس ليال: في ليلة الجمعة، وليلة الأضحى، وليلة الفطر، وأول ليلة من رجب، وليلة النصف من شعبان. 
অর্থ: তিনি বলেন- আমাদের কাছে এ খবর পৌঁছেছে যে, পাঁচ রাতে দু’আ কবুল হয়। জুমার রাতে, ঈদুল আযহার রাতে, ঈদুল ফিতরের রাতে, রজব মাসের প্রথম রাতে এবং অর্ধ শাবানের রাতে তথা শবে বরাতে। 
(আল উম্ম ২/৪৮৫)

* প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হাফেজ ইবনুস সালাহ রাহ. (মৃ. ৬৪৩ হি.) এক প্রশ্নের উত্তরে তাঁর ফতওয়াতে লিখেন-
وَأما لَيْلَة النّصْف من شعْبَان فلهَا فضيلة وإحياؤها بِالْعبَادَة مُسْتَحبّ، وَلَكِن على الِانْفِرَاد من غير جمَاعَة. 
"অর্ধ শাবানের রাতের ফযীলত রয়েছে। তাই এ রাতে ইবাদত করা মুস্তাহাব। তবে জামা’আত সহকারে নয়। বরং একাকীভাবে করবে।"

* শাফিয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফকীহ ইবনে হাজার হায়তামী রাহ. (মৃত্যু ৯৭৪ হি.) তাঁর “ফাতাওয়া” গ্রন্থে শবে বরাত সম্পর্কীয় একাধিক হাদীস উলে­খ করার পর বলেন- 
والحاصل أن لهذه الليلة فضلا، وأنه يقع فيها مغفرة مخصوصة واستجابة مخصوصة، ومن ثم قال الشافعي - رضي الله عنه -: إن الدعاء يستجاب فيها.
"সারকথা হচ্ছে, এ রাতের ফযীলত স্বীকৃত। এ রাতে বিশেষ মাগফিরাত ও ইসতিজাবাত সুসাব্যস্ত। আর তাই ইমাম শাফিয়ী রাহ. বলেছেন- এ রাতে দু’আ কবুল হয়।"

   
    >>>হাম্বলী মাযহাব<<<

* শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী রাহ. বলেন, শবে বরাতে একাকীভাবে নামায আদায় করা উত্তম।  
(মাজমুঅাতুল ফাতাওয়া ২৩/৮০)

* হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলী রাহ. (মৃ. ৭৯৫ হি.) “লাতায়িফুল মা’আরিফ” গ্রন্থে এ বিষয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। তাতে এক স্থানে লিখেন-
فينبغي للمؤمن: أن يتفرغ في تلك الليلة لذكر الله تعالى ودعائه بغفران الذنوب وستر العيوب وتفريج الكروب، وأن يقدم على ذلك التوبة؛ فإن الله تعالى يتوب فيها على من يتوب.
"অর্থাৎ মুমিন ব্যক্তির এ রাতে আল­াহ তাআলার যিকির ও মাগফেরাতের দু’আ ইত্যাদিতে মশগুল থাকা উচিৎ। এর পূর্বে তাওবা করবে। কেননা আল্লাহ পাক এ রাতে তাওবাকারীর তাওবাকে কবুল করেন।"
(লাতা‌য়িফুল মাঅা‌রিফ, ইব‌নে রজব পৃ. ২৬৫)

* হাম্বলী মাযহাবের সুপ্রসিদ্ধ ফকীহ শাইখ মানসুর ইবনে ইউনুস আল-বুহুতী রাহ. (মৃ. ১০৫১ হি.) লিখেন-
(وفي استحباب قيامها) أي ليلة النصف من شعبان (ما في) إحياء (ليلة العيد، هذا معنى كلام ابن رجب) (في) كتابه المسمى (اللطائف) في الوظائف.
"দুই ঈদের রাতের মত এ রাতেও জেগে থেকে ইবাদত করা মুস্তাহাব।"
(কাশশাফুল কিন অা‌নিল ইকনা, শাইখ মানসুর ৩/১১২)

চল‌বে...

‌লি‌খে‌ছেন
মাওলানা সাঈদ অাহমদ (দা.বা.)
উস্তাদ, দারুল উলূম হাটহাজারী।
শবে বরাতের আমল ও করণীয় (পর্ব:০৪) মাওলানা সাঈদ আহমদ (দা.বা.)

শবে বরাতের আমল ও করণীয় (পর্ব:০৪) মাওলানা সাঈদ আহমদ (দা.বা.)



আল্লাহ পাক শ‌বে বরা‌তে রহমত ও মাগফিরাতের দরজা ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত করেন, যা গ্রহণে ব্যস্ত হওয়া বান্দার জন্য অতীব প্রয়োজন। এখন জানার বিষয় হল, এর পদ্ধতি কী হবে বা এর জন্য শরীয়তের কোন দিক-নির্দেশনা আছে কি না? এ প্রসঙ্গে একটি হাদীস উল্লেখ করছি :
عَنِ الْعَلَاءِ بْنِ الْحَارِثِ أَنَّ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَامَ رَسُولُ اللهِ  مِنَ اللَّيْلِ يُصَلِّي، فَأَطَالَ السُّجُودَ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ قَدْ قُبِضَ، فَلَمَّا رَأَيْتُ ذَلِكَ قُمْتُ حَتَّى حَرَّكْتُ إِبْهَامَهُ فَتَحَرَّكَ فَرَجَعْتُ، فَلَمَّا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ السُّجُودِ، وَفَرَغَ مِنْ صَلَاتِهِ، قَالَ: يَا عَائِشَةُ, أَوْ يَا حُمَيْرَاءُ! ظَنَنْتِ أَنَّ النَّبِيَّ خَاسَ بِكِ؟ قُلْتُ: لَا وَاللهِ يَا رَسُولَ اللهِ! وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ قُبِضْتَ لِطُولِ سُجُودِكَ، فَقَالَ: " أَتَدْرِينَ أَيَّ لَيْلَةٍ هَذِهِ؟ " قُلْتُ: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: " هَذِهِ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَطْلُعُ عَلَى عِبَادِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِلْمُسْتَغْفِرِينَ، وَيَرْحَمُ الْمُسْتَرْحِمِينَ، وَيُؤَخِّرُ أَهْلَ الْحِقْدِ كَمَا هُمْ ". 
رواه البيهقي في "شعب الإيمان" (৩৫৫৪) وقال: هَذَا مُرْسَلٌ جَيِّدٌ, وَيُحْتَمَلُ أَنْ يَكُونَ الْعَلَاء بْنُ الْحَارِثِ أَخَذَهُ مِنْ مَكْحُولٍ. وَاللهُ أَعْلَمُ،
অর্থ : “হযরত আলা ইবনুল হারিস রাহ. থেকে বর্ণিত, আয়েশা রা. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ রাতে নামাযে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সেজদা করেন যে, আমার ধারণা হল তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুুলি নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করলেন, তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা অথবা বলেছেন, ও হুমাইরা! তোমরা কি এই আশংকা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার আশংকা হয়েছিল, আপনি ইনতিকাল করেছেন কিনা। নবীজী সা. জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূলুল্লাহ সা. তখন ইরশাদ করলেন, “এটা হল অর্ধ শাবানের রাত (তথা শবে বরাত)। আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহ প্রার্থনাকারীদের অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন।”
(শুআবুল ঈমান, বায়হাকী ৫/৩৬১)

এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়, এ রাতে দীর্ঘ নফল নামায পড়া, যাতে সেজদাও দীর্ঘ। তবে মনে রাখতে হবে যে, কতিপয় অনির্ভরযোগ্য ওযীফা বা বই-পুস্তকে ‘শবে বরাতের নামায’ এর নামে যে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন লেখা আছে “অর্থাৎ ১২ কিংবা ১৬ রাকাআত অথবা এত রাকাআত হতে হবে, প্রতি রাকাআতে সূরা ইখলাস বা এই এই সূরা এতবার পড়তে হবে” এগুলো ঠিক নয়, হাদীস শরীফে নামাযের এমন কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নেই।এ সংক্রান্ত যেসব বর্ণনা রয়েছে, সেগুলোকে মুহাদ্দিসগণ মাওযূ তথা জাল বলেছেন। কাজেই এগুলো মানুষের মনগড়া পন্থা। সঠিক পদ্ধতি হল, নফল নামাযের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দুই রাকাআত করে পছন্দ মতো সূরা মিলিয়ে যত রাকাআত সম্ভব পড়া।

>> রাত্রি জাগরণের অর্থ ও মর্ম <<

শবে বরাত পালন বা রাত্রি জাগরণের অর্থ ও মর্ম কী বা এ থেকে উদ্দেশ্য কী? এ প্রসঙ্গে ফিকহের প্রায় কিতাবে যা বলা হয়েছে, তা আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী রাহ. (মৃত্যু ১২৫২ হি.) এর শব্দে উল্লেখ করছি :  
ويحصل القيام بالصلاة نفلا فرادى من غير عدد مخصوص، وبقراءة القرآن، والأحاديث وسماعها، وبالتسبيح والثناء، والصلاة والسلام على النبي  الحاصل ذلك في معظم الليل، وقيل بساعة منه.
অর্থাৎ “রাত্রি জাগরণের তাৎপর্য এই যে, রাতের অধিকাংশ সময়ে, (কারো কারো মতে,) কিছু অংশে কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা ব্যতীত একাকী নফল নামায আদায় করা, কুরআন-হাদীস তেলাওয়াত করা বা শুনা, তাসবীহ পাঠ করা এবং নবীজি সা. এর উপর দরূদ ও সালাম পেশ করা।” (ফাতাওয়ায়ে শামী, ইবনে আবেদীন ২/৪৬৯)
 
এ আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এ রাত্রে ইবাদত করার জন্য বিশেষ কোন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা তথা নির্দিষ্ট সংখ্যার (বারো কিংবা ষোল রাকাত) নামায জামাআত সহকারে আদায় করা অথবা সাওয়াবের নামে কিংবা অন্য উদ্দেশ্যে হালুয়া-রুটি, বিরানী-তবারুক বিতরণ করা ইসলামী শরীয়তে এর কোন ভিত্তি নেই।

চল‌বে...

‌লি‌খে‌ছেন
মাওলানা সাঈদ আহমদ (দা.বা.)
উস্তাদ, দারুল উলূম হাটহাজারী।

Tuesday, April 7, 2020

শবে বরাতের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিভ্রান্তি ও অপ‌নোদন | মাওলানা সাঈদ আহমদ দা.বা. (পর্ব :০৩)

শবে বরাতের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিভ্রান্তি ও অপ‌নোদন | মাওলানা সাঈদ আহমদ দা.বা. (পর্ব :০৩)



শবে বরাতের ফযীলতকে কেউ কেউ ভিন্ন আঙ্গিকে অস্বীকারের অপপ্রয়াস চালান। আর তা এভাবে যে, “এ রাতের ফযীলত অন্যান্য রাতের চেয়ে ব্যতিক্রম নয়। কেননা এ রাতে যেভাবে আল্লাহ পাক নিচের আসমানে আসেন এবং বহু সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করেন, তেমনিভাবে প্রতি রাতের শেষভাগেও তিনি দুনিয়ার আসমানে এসে অনেক বান্দাকে ক্ষমা করেন। যেমন, বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ হাদীস, যা রাসূল সা. থেকে আটাশ জন সাহাবী বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমের হাদীসটি এভাবে এসেছে : 
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ : إِذَا مَضَى شَطْرُ اللَّيْلِ، أَوْ ثُلُثَاهُ يَنْزِلُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَقُولُ: هَلْ مِنْ سَائِلٍ يُعْطَى؟ هَلْ مِنْ دَاعٍ يُسْتَجَابُ لَهُ؟ هَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ يُغْفَرُ لَهُ؟ حَتَّى يَنْفَجِرَ الصُّبْحُ. 

আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, রাতের একাংশ বা দুই-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হলে আল্লাহ পাক দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। অতঃপর বলতে থাকেন, কে আছ আমার নিকট কিছু চাইবে? আমি তাকে প্রদান করব। কে আছ আমার নিকট দুআ করবে? আমি তার দুআ কবুল করব। কে আছ আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। এভাবে ফজর পর্যন্ত বলতে থাকেন। সহীহ (মুসলিম হাদীস নং- ৭৫৮)

বর্ণিত হাদীস থেকে বুঝা যায়, এ রাত এবং বছরের অন্য রাতের মাঝে তেমন কোন পার্থক্য নেই। কাজেই এ রাতকে বিশেষভাবে ফযীলতপূর্ণ মনে করার কোন যৌক্তিকতা নেই।”

এ প্রসঙ্গে সঠিক ও বাস্তব কথা হল, যদিও অগভীর চিন্তার কারণে বাহ্যিকভাবে মনে হয় এ রাত এবং বছরের অন্য রাতের মাঝে তেমন কোন ফরক নেই। কিন্তু হাদীস বিশারদদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকে এ রাতের তিনটি বৈশিষ্ট্য জানা যায় : 

ক. মোল্লা আলী কারী রাহ. (মৃ. ১০১৪ হি.) ‘মিরকাত’ গ্রন্থে লিখেন- 
وظاهر الحديث: أن هذا النزول يعم هذه الليلة، فتمتاز بذلك على سائر الليالي; إذ النزول الوارد فيها خاص بثلث الليل.
অর্থাৎ “হাদীসের ভাষ্য থেকে এ কথা প্রকাশ পায় যে, এ রাতে আল্লাহ পাক নিচের আসমানে অবতীর্ণ হওয়াটা অন্যান্য রাত থেকে ভিন্ন। কেননা অন্যান্য রাতে অবতীর্ণ হওয়াটা রাতের তৃতীয়াংশে হয়। আর এখানে পুরো রাত জুড়েই হয়। ফলে এর মাধ্যমে রাতটি অন্যান্য রাত থেকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ, মোল্লা আলী কারী ৩/৩৭৫)

খ. এ রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মাগফেরাতের দ্বার ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হয, যা অন্যান্য রাতে হয় না। যেমন, হাফেজ যাইনুদ্দীন ইরাকী রাহ. (মৃ. ৮০৬ হি.) আয়েশা রা. এর হাদীসের ব্যাখ্যায় উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যদ্বয়ের কথা উল্লেখ করে সুস্পষ্টভাবে বলেন,
مزية ليلة نصف شعبان - مع أن الله تعالى ينزل كل ليلة - أنه ذكر مع النزول فيها وصف آخر لم يذكر في نزول كل ليلة, وهو قوله: "فَيغْفِرُ فِيها لِأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ"، وليس
 ذا في نزول كل ليلة. ولأن النزول في كل ليلة مؤقت بشطر الليل، أو ثلثه وفيها من الغروب.
অর্থাৎ “বছরের প্রতি রাতে আল্লাহ পাক অবতরণ করলেও ভিন্ন দু’টি কারণে অর্ধ শাবানের রাতটি অন্যান্য রাত থেকে বৈশিষ্ট্যম‌ণ্ডিত। 

এক. অধিক সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, যা অন্যান্য রাতে হয় না।
দুই. এ রাতে সূর্য অস্ত যাওয়া তথা মাগরিব হওয়ার সাথে সাথে অবতরণ করেন, যা অন্যান্য রাতে রাত্রির শেষাংশে বা তৃতীয়াংশে হয়। (ফয়যুল কাদীর, মুনাবী ২/৩১৭ হা. ১৯৪২)

গ. বছরের প্রতি রাতে আল্লাহ পাকের অবতরণের হুকুমের মধ্যে এই রাত অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরও বিশেষভাবে এই রাত্রিতে অবতরণের কথা পুনরাবৃত্তি করাটা নিশ্চয় এ রাতটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার প্রমাণ বহন করে। যেমনটি হাফেজ আবু মুসা মাদীনী রাহ. বলেছেন।

আরো একটু ব্যাখ্যা করলে এভাবে বলা যেতে পারে, বিশেষভাবে এই রাতে “আল্লাহ পাকের নিচের আসমানে অবতীর্ণ হওয়ার কথা”- হতে পারে এই জন্য উল্লেখ করা হয়েছে- আমরা যাতে সতর্ক হই। গাফলত ও আলস্যতার ঘুম থেকে জাগ্রত হই। যেন বলা হচ্ছে, “হে বান্দা! বছরের প্রতিটি রাতের শেষ বা তৃতীয়াংশে আমি আল্লাহ অবতরণ করি ক্ষমা প্রদানের জন্য, আশা পূরণ করার জন্য। কিন্তু এ সুযোগ হেলায় খেলায় হারিয়েছ। আর নয়, এবার ব্যাপকহারে পুণ্য অর্জনের মৌসুমটি (রমযান মাস) নিকটবর্তী হয়েছে। শাবানের অর্ধেক অতিবাহিত হয়ে গেল, এবার ফিরে এস, সুযোগের সৎ ব্যবহার কর আর আমলে উৎসাহী হও। আল্লাহ পাক এই রাতে মাগরিব হওয়ার সাথে সাথে অবতরণ করেন, পুরো রাত জুড়েই থাকেন, রহমত ও মাগফিরাত অধিকহারে বিতরণ করেন। সুতরাং তা গ্রহণে ব্যস্ত হও”।

চল‌বে...

‌লি‌খে‌ছেন
মাওলানা সাঈদ অাহমদ (দা.বা.)
উস্তাদ, দারুল উলূম হাটহাজারী।
শবে বরাতের প্রামাণিকতা  (পর্ব-02) মাওলানা সাঈদ অাহমদ (দা.বা.)

শবে বরাতের প্রামাণিকতা (পর্ব-02) মাওলানা সাঈদ অাহমদ (দা.বা.)



‘ইসলামে শবে বরাত বলতে কিছু নেই’ এই দাবীর উত্তাপন বেশি দিন আগের নয়। গত কয়েক বছর ধরে শোনা যাচ্ছে যে, শবে বরাত (লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান) বিদআত, তা কেবল উপমহাদেশেই পালিত হয় এবং এর কোনো ফযীলত হাদীস শরীফে প্রমাণিত নেই। আবার এ রাতের ফযীলত সম্পর্কে যত রেওয়ায়েত (বর্ণনা) আছে সবই মাওযূ (বানোয়াট ও গুজব) অথবা যয়ীফ (দুর্বল)। কাজেই শবে বরাতকে ফযীলতপূর্ণ রাত মনে করে এ রাতে জাগ্রত থেকে নামায-দুআ ও যিকির-তেলাওয়াতসহ যে কোন নফল ইবাদত করা বিদআত ও নাজায়েয।

অথচ মুসলিম উম্মাহর মাঝে এ রাতটির গুরুত ও মহত্ত না আজকের, না বছর কয়েক পূ‌র্বের বরং ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর ধরেই এর ধারা চলে আসছে। আবার এমনও নয় যে, কারও ভিন্ন প্রক্রিয়ার স্পন্দনে রাতটির গুরুত্ব মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে, বরং এ রাতের ফযীলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে দশজন সাহাবী থেকে মারফূ’ হাদীস (সরাসরি রাসূল থেকে) বর্ণিত, যা সমষ্টিগত দিক থেকে সন্দেহাতীতভাবে সহীহ এর মানে উন্নীত। মুহাদ্দিসীনে কেরাম স্বীয় হাদীসগ্রন্থসমূহে বিভিন্ন শিরোনামে তা লিপিবদ্ধ করেছেন। তাদের কেউ কেউ এগুলো থেকে প্রমাণও গ্রহণ করেছেন। ফুকাহা ও মুফতীগণ হাদীসগুলোর আলোকে ফিকাহর কিতাবসমূহে মুবাহ-মুস্তাহাবের বর্ণনা দিয়েছেন। 

এছাড়া অনেকে বিক্ষিপ্ত লিখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে এ রাতের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ তুলে ধরেছেন। আর এ রাতকে কেন্দ্র করে প্রস্তুত করা হয়েছে গবেষণালদ্ধ অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও ছোট-বড় অসংখ্য গ্রন্থ। সুতরাং শবে বরাতের ফযীলত ভিত্তিহীন বলা অজ্ঞতা বা ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়। নিম্নে এ সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা হল। 

হাদীসের আলোকে শবে বরাত
প্রথম হাদীস :
 
عَنْ مَكْحُولٍ، عَنْ مَالِكِ بْنِ يُخَامِرَ، عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ ، عَنِ النَّبِيّ قَالَ يَطْلُعُ اللَّهُ إِلَى خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ

হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা. বলেন, নবী কারীম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে তথা শবে বরাতে) সৃষ্টিকুলের প্রতি (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত আর সবাইকে মাফ করে দেন।  সহীহ ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫

দ্বিতীয় হাদীস :
 
عَنْ يَحْيَى، عَنْ عُرْوَةَ، عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: فَقَدْتُ رَسُولَ اللهِ لَيْلَةً فَخَرَجْتُ، فَإِذَا هُوَ بِالبَقِيعِ، فَقَالَ: أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ؟ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ! إِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ، فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ

আয়েশা রা. বলেন, এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহকে বিছানায় না পেয়ে খুঁজতে বের হলাম, ‘বাকী’ নামক (জান্নাতুল বাকী) কবরস্থানে তাঁকে পেলাম। তখন (আমার অবস্থাদৃষ্টে) রাসূল   বললেন, তুমি কি মনে কর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল   তোমার উপর জুলুম করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম, আপনি অন্য কোন স্ত্রীর ঘরে (কারণবশত) তাশরীফ নিয়েছেন। তখন রাসূল   ইরশাদ করলেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং “কাল্ব” গোত্রের ছাগলসমূহের পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক গুনাহগারকে ক্ষমা করে দেন। (মুসনাদে আহমদ হা. ২৬০১৮; সুনানে তিরমিযী হা. ৭৩৯; ইবনে মাজা হা. ১৩৮৯)

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : 
‘কালব’ গোত্রের কথা এই জন্য বলা হয়েছে যে, তখনকার সময় আরব দেশে তাদের চেয়ে বেশি ছাগল আর কারো ছিল না। উদ্দেশ্য হচ্ছে, উক্ত রাতে আল্লাহ পাকের ব্যাপক ও অধিকহারে মাগফিরাত ও ক্ষমার প্রতি উম্মতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। (শরহুয যুরকানী আলাল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যা, যুরকানী ১০/৫৬০ )

শবে বরাত সম্পর্কে আরো নয়টি হাদীসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

এ রাত সম্পর্কে উলি­খিত প্রথম ও দ্বিতীয় হাদীসের মূল বক্তব্য সম্বলিত আরো নয়জন সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণনা পাওয়া যায়। লেখার কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় পৃথক পৃথকভাবে না বলে মূলকথা তুলে ধরা হলো।

উল্লিখিত সাহাবীদ্বয় ব্যতীত আরো যে সমস্ত সাহাবী রাসূল   থেকে এ রাত সম্পর্কে হাদীস বর্ণনা করেছেন (সাহাবা এজন্য বলেছি যে, তাবিয়ী থেকেও এ রাত সম্পর্কে সহীহ ও দুর্বল সনদে বর্ণনা রয়েছে) তারা হলেন- পূর্বের সাহাবীদ্বয়সহ (৩) প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর রা. (৪) আবু সা’লাবা আল-খুশানী (৫) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (৬) আবু মুসা আল-আশআরী (৭) আবু হুরায়রা (৮) আউফ ইবনে মালিক (৯) উসমান ইবনে আবীল আস (১০) আবু দারদা (১১) ও আবু উমামা রাযিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ। 

(প্রথম থেকে অষ্টম সাহাবী পর্যন্ত হাদীসসমূহ সবিস্তারে জানার জন্য দেখুন শায়খ আলবানীর “সিলসিলায়ে সহীহা” ৩/১৩৫-১৩৮ হা. ১১৪৪। নবম হাদীস দেখুন বায়হাকীর “শুয়াবুল ঈমান” হা. ৩৫৫৫। দশম হাদীস রয়েছে হাফেজ আব্দুল গণী মুকাদ্দিসী (মৃ. ৬০০ হি.) এর “আহাদীসুল জামায়ীলী” নামক গ্রন্থে হা. ৩৭। আর একাদশ হাদীস পাবেন হাসান খল্লাল (মৃ. ৪৩১ হি.) এর “আল-মাজালিসুল আশারা আল-আমালী” কিতাবে হা. ৩।)

চল‌বে...

‌লি‌খে‌ছেন
মাওলানা সাঈদ অাহমদ (দা.বা.)
উস্তাদ, দারুল উলূম হাটহাজারী।

Monday, April 6, 2020

শবে বরাত করণীয় ও বর্জনীয় (পর্ব-০১)

শবে বরাত করণীয় ও বর্জনীয় (পর্ব-০১)


শ‌বে বরাত : করণীয় ও বর্জনীয়  (পর্ব-01) মাওলানা সাঈদ আহমদ দা.বা.

আল্লাহ তাআলা তাঁর চিরন্তন ধারা অনুযায়ী কোন স্থানকে অন্য স্থানের উপর, কোন সময়কে অন্য সময়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য দান করেছেন। মাহে রমজান সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও সুমহান। জুমার দিন অন্য দিনের তুলনায় মর্যাদাবান। অন্যান্য স্থানের উপর মক্কা-মদীনার অধিক সম্মান। অনুরূপ শবে কদরের পরে অন্যান্য রজনীর চেয়ে শবে বরাতের স্থান।

মুসলমানদের এই করুণ অবস্থায় যেখানে আমাদের এক হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া দরকার, সেখানে সাধারণ ও মুস্তাহাব বিষয়ে কলহ সৃষ্টি করা এবং এ নিয়ে মাতামাতি করা উম্মতের ঐক্যের জন্য অনেক ক্ষতিকর। তবে উম্মতের ঐক্যের পাশাপাশি, কুরআন-সুন্নাহর সঠিক বুঝের অভাবে কেউ যেন কোন আমল ছেড়ে না দেন কিংবা আমলের নামে বিদআত বা শরীয়তবিরোধী কাজে লিপ্ত না হয়ে পড়েন সেদিকে খেয়াল রাখাও জরুরী। কারণ আমরা সবাই জানি আল্লাহ পাক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। তাই ইবাদতে যাতে কম না হয় কিংবা ইবাদতে যাতে শরীয়তবিরোধী কিছু না হয় এজন্য আমাদেরকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

আজকাল শবে বরাত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। শবে বরাতকে কেন্দ্র করে লোকজন কলহ-বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ এর ফাযায়েল ও গুরুত্ব বর্ণনা করছেন। আবার কেউ কেউ এর অস্তিত্বকেই পুরোদমে অস্বীকার করে বসছেন। এমন কি এটা হিন্দুদের লক্ষ্মীপূজা সাদৃশ্যও বলছেন নাউযুবিল্লাহ। আবার কেউ আমলের নামে এমন সব কাজও করছেন, যা কুরআন-হাদীসের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এক্ষেত্রে অনেকে বিধর্মীদের রেওয়াজও অনুসরণ করেছেন।

এতদিন পর্যন্ত শবে বরাতকে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর মানুষ বাড়াবাড়িতে লিপ্ত ছিল। তারা এ রাতটি উপলক্ষে নানা অনুচিত কাজকর্ম এবং রসম-রেওয়াজের অনুগামী হচ্ছিল। উলামায়ে কেরাম সবসময়ই এসবের প্রতিবাদ করেছেন এবং এখনো করছেন। ইদানিং আবার এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ছাড়াছাড়ির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাদের দাবি হল, ‘ইসলামে শবে বরাতের কোন ধারণা নেই। এ ব্যাপারে যত রেওয়ায়েত আছে সব মাওযূ বা যয়ীফ। এসব অনুযায়ী আমল করা এবং শবে বরাতকে বিশেষ কোন ফযীলতপূর্ণ মনে করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নয়।’ তারা এসব বক্তব্যসম্বলিত ছোট ছোট পুস্তিকা ও লিফলেট তৈরি করে মানুষের মধ্যে বিলি করছে।

বাস্তবকথা হল, আগেকার সেই বাড়াবাড়ির পথটিও যেমন সঠিক ছিল না, এখনকার এই ছাড়াছাড়ি মতটিও শুদ্ধ নয়। কেননা শরীয়তে ছাড়াছাড়ির যেমন অবকাশ নেই, তেমনি বাড়াবাড়িরও কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। ইসলাম ভারসাম্যতার দ্বীন এবং এর সকল শিক্ষাই প্রান্তিকতামুক্ত সরল পথের নির্দেশনা দেয়।

শবে বরাতের ব্যাপারে সঠিক ও ভারসাম্যতাপূর্ণ অবস্থান হল, এ রাতের ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সম্মিলিতভাবে কোন রূপ না দিয়ে এবং এই রাত উদযাপনের বিশেষ কোন পন্থা উদ্ভাবন না করে বেশি ইবাদত করাও নির্ভরযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এই রাতকে অন্য সব সাধারণ রাতের মত মনে করা এবং এ রাতের ফযীলতের ব্যাপারে যত হাদীস এসেছে তার সবগুলো ‘মাওযূ বা যয়ীফ’ মনে করা যেমন ভুল, তেমনি এ রাতকে শবে কদরের মত বা তার চেয়েও বেশি ফযীলতপূর্ণ মনে করাও একটি ভিত্তিহীন ধারণা।

আমাদের ধারাবাহিক আলোচনাতে শবে বরাতের সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে এবং বাড়াবাড়ি ছাড়াছাড়ির বিরুদ্ধে দলীল-প্রমাণ পেশ করা হয়েছে।

>> শবে বরাত পরিচিতি <<
আরবী বছর বা হিজরী সনের ৮ম ও রমযানের পূর্ব মাস হচ্ছে, শাবান। এ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে বলা হয় ‘শবে বরাত’।

শবে বরাতের আভিধানিক অর্থ
শবে বরাত দু’টি শব্দের সমষ্টি। ‘শব’ শব্দটি মূলত ফার্সী, যার অর্থ রাত, রজনী। ‘বরাত’ শব্দকে যদি ফার্সী ধরা হয় অর্থ হবে, সৌভাগ্য। আর শব্দদ্বয়ের একত্র অর্থ হবে, ভাগ্য রজনী বা সৌভাগ্যের রাত।
আর যদি ‘বরাত’ শব্দটি আরবী ‘বারাআত’ ((براءة শব্দের অপভ্রংশ ধরা হয়, তাহলে অর্থ হবে, পরিত্রাণ বা মুক্তি। যেমন, এ অর্থে কুরআনে কারীমে এসেছে। (সূরা কামার : ৪৩)
অতএব শব্দদ্বয়কে আরবীতে অনুবাদ করা হলে বলতে হবে, “লাইলাতুল “বারাআহ” ((ليلة البراءة। যেমন ইমাম বায়হাকী রাহ. (মৃ. ৪৫৮ হি.) “আদ-দা’ওয়াতুল কাবীর” গ্রন্থে একটি শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে, “বাবুল কাওলী ওয়াদ-দুআ লাইলাতাল বারাআহ” (باب القول والدعاء ليلة البراءة)। তবে হাদীসের ভাষায় বলা হয়েছে, (ليلة النصف من شعبان) অর্থাৎ অর্ধ শাবানের রাত।
উল্লেখ্য, যারা বলেন, ‘শবে বরাত’ বলতে কোন শব্দ কুরআন-হাদীসে নেই, এর কোন ভিত্তি নেই বা পালন করা বিদআত ইত্যাদি। তাদের প্রতি সবিনয়ে প্রশ্ন থাকবে, নামায-রোযা বলতে কোন শব্দও কুরআন-হাদীসে নেই, বরং সালাত ও সওম রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কী বলবেন?

চল‌বে...

‌লি‌খে‌ছেন
মাওলানা সাঈদ অাহমদ (দা.বা.)
উস্তাদ, দারুল উলূম হাটহাজারী।