Showing posts with label কুরআনের কাহিনী. Show all posts
Showing posts with label কুরআনের কাহিনী. Show all posts

Sunday, March 12, 2017

হযরত সালেহ (আঃ) এর ঘটনা

হযরত সালেহ (আঃ) এর ঘটনা

সামুদ জাতির নিকট হযরত সালেহ (আঃ) রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। সামুদ জাতি অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী ছিল, শস্য-শ্যামলিমায় পরিপূর্ণ ছিল তাদের এলাকা। বাগ-বাগিচা, ঝর্ণায় এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছিল তাদের চতুর্দিকে। কিন্তু এ হতভাগা জাতি আল্লাহ পাকের অবাধ্য অকৃতজ্ঞ ছিল। মূর্তি পূজা ও ডাকাতি- রাহজানিতে লিপ্ত ছিল। তাই হযরত সালেহ (আঃ) তাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন।

হযরত (আঃ)- কওমের লোকজন যখন তাঁর দাওয়াতের দরম্নন বিরক্ত হয়ে গেল, তখন তাদের নেতৃত্বস্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি জনতার সামনে হযরত সালেহ (আঃ) কে বলল যে, সত্যিই যদি তুমি আ্ল্লাহর প্রেরিত নবী হও, তাহলে এ ব্যাপারে কোনো মুজেযা বা নিদর্শন দেখাও। এতে আমরা তোমার সত্যতায় বিশ্বাস করবো। হযরত সালেহ (আঃ) বললেন, এমন যেন না হয় যে, উক্ত নিদর্শন দর্শনের পরও তোমরা তোমাদের ভ্রান্ত্ম মতবাদ ও ধর্ম বিশ্বাসের উপর অনড় থাকবে। নেতৃবর্গ তখন জোরালো ভাবে বলল, না, আমরা তা দেখার মাত্রই ঈমান আনায়ন করবো। হযরত সালেহ (আঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কোন ধরনের নিদর্শন চাও? তারা জবাবে বলল- সামনের পাহাড় বা বসতির এ পাথর থেকে একটি গর্ভবতী উষ্ট্রী বের করে দেখাও, আর উক্ত উষ্ট্রীটি বের হওয়ার পর পরই সবার সামনে বাচ্ছা প্রসব করবে।

হযরত সালেহ (আঃ) আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে দোয়া করলেন। ফলে তখনই উক্ত পাথর থেকে একটি গর্ভবতী উষ্ট্রী বেরিয়ে এলো এবং সাথে সাথে একটি বাচ্ছা প্রসব করলো। এ থেকে তাদের নেতৃবর্গের মধ্য হতে জুনদা ইবনে ওমর তো তখনই ঈমান নিয়ে এলো, আর অন্যান্যরাও যখন তার অনুকরণে ঈমান আনবে এমন সময় তাদের মন্দিরের ঠাকুর ও পুরোহিতরা তাদের কে নানা কথা বলে ঈমান আনা থেকে বিরত রাখল।

হযরত সালেহ (আঃ) কওমের সকলকে বিভিন্ন ভাবে বুঝালেন। তিনি বললেন- দেখ! তোমাদের কামনা মতেই এ উষ্ট্রী প্রেরিত হয়েছে। আলস্নাহ তা’য়ালার এটাই সিদ্ধান্ত যে, এর জন্য পানি পানের পালা নির্দিষ্ট থাকবে। একদিন এই উষ্ট্রী, আরেক দিন অন্য সকল লোকজনের ও তাদের পালিত পশুর জন্য নির্দিষ্ট থাকবে। আর সাবধান! এর যেন কোনোরূপ কষ্ট না হয়। এর যদি কোনোরূপ কষ্ট হয় তাহলে তোমাদের কোনো নিস্তার নেই। বেশ কিছু দিন পর্যন্ত এ ধারা বহাল ছিলো। বহু লোক তার দুধ দ্বারা উপকৃত হতো। তবে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে এ বিষয়টি অসহনীয় হয়ে উঠে। তাদের পরস্পরের মধ্যে পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র হতে থাকে যে, এ উষ্ট্রীকে মেরে ফেলতে হবে। যাতে পালাবণ্টন থেকে মুক্তি লাভ হয়। কেননা এটা আমাদের নিজেদের ও আমাদের পশু-পাখিদের জন্য অত্যন্ত দুর্বিসহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সবাই এর দরুন কষ্টের শিকার হচ্ছি। তবে তাকে হত্যা করার কারো হিম্মত হচ্ছিল না।

পরে সামূদ নামক জনৈক সুন্দরী ধণবতী রমনী নিজেকে ‘মিসদা’ নামক ব্যক্তির সামনে এবং অপর ধণবতী রমনী উনায়যা তার সুন্দরী কন্যাকে কায়দার বা [কুদার] নামক ব্যক্তির সামনে এ কথা বলে পেশ করল যে, তারা যদি উক্ত উষ্ট্রীকে মেরে ফেলতে পারে, তাহলে এরা তাদের মালিকানাধীন হয়ে যাবে। তাদের কে বিবাহ করে আনন্দ উপভোগ করবে। তাদের এই উত্তেজনাকর প্রস্তাবে কায়দার ইবনে সালিফ ও মিসদা উদ্ধুদ্ধ হয়ে এর জন্য প্রস্ত্মুতি নিলো। তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, উষ্ট্রীর চলাচল পাথে আত্বগোপন করে বসে থাকবে। উষ্ট্রীটি যখন মাঠের দিকে যাওয়ার জন্য বের হবে, তখন অতর্কিত তার উপর আক্রমণ করবে। এ ব্যাপারে তারা আরো কয়েকজনের সহায়তা কামনা করলো এবং তারা তাতে সম্মত হলো।

মোটকথা উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত মাফিক উষ্ট্রীকে হত্যা করে ফেলল। তারা পরস্পরে এও প্রতিজ্ঞা করল যে, রাতে আমরা সবাই একত্র হয়ে সালেহ (আঃ) ও তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করব। তাদের অভিবাবকদের কেউ আমাদের কে সন্দেহ বা দোষারোপ করলে আমরা বলব যে, এ কাজ আমরা করিনি। আমরা তো সেখানে হাজিই ছিলাম না। উষ্ট্রীকে হত্যা করার পর তার বাচ্ছাটি পালিয়ে পাহাড়ে উঠে চিৎকার করতে করতে এক পর্যায়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। হযরত সালেহ (আঃ)- এ বিষয়ে অবগত হওয়ার পর বললেন, অবশেষে তাই হলো আমি যার আশঙ্কা করছিলাম। এখন তোমরা আল্লাহর আজাবের অপেক্ষা কর। তিনদিনের মধ্যে আল্লাহর আজাব এসে তোমাদের কে অনিবার্য ধ্বংস করে ফেলবে। তাই হল। আর ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এক শিক্ষণীয় কাহিনী হয়ে রয়ে গেল।

[Fb: Sabbir Ahmad juwel]

জাকারিয়া (আঃ) এর সন্তান লাভ

জাকারিয়া (আঃ) এর সন্তান লাভ

জাকারিয়া (আঃ) এর সন্তান লাভ
এটা তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর দাস জাকারিয়ার (আঃ) প্রতি। যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করেছিল নিভৃতে।

সে বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি দুর্বল হয়েছে, বার্ধ্যক্যে আমার মস্তক শুভ্রোজ্জ্বল হয়েছে; হে আমার প্রতিপালক! আপনাকে আহ্বান করে আমি কখনো ব্যর্থকাম হই নাই। আমি আশংকা করি আমার পর আমার স্বগোত্রীয়দের (দ্বীনকে ধ্বংস করে দিবে) আমার স্ত্রী বন্ধ্যা, সুতরাং আপনি আপনার নিকট হতে আমাকে দান করুন উত্তরাধিকারী। যে আমার উত্তরাধিকারিত্ব করবে এবং উত্তরাধিকারিত্ব পাবে ইয়াকুবের (আঃ) বংশের, এবং হে আমার প্রতিপালক! তাকে করুন সন্তোষভাজন।

তিনি (আল্লাহ্) বললেন, হে যাকারিয়া (আঃ)! আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি। তার নাম হবে ইয়াহইয়া (আঃ); এই নামে আমি পূর্বে কারো নামকরণ করি নাই। সে বললো, হে আমার প্রতিপালক! কেমন করে আমার পুত্র হবে যখন আমার স্ত্রী বন্ধ্যা ও আমি বার্ধক্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি! তিনি বললেন, এই রূপই হবে; এটা আমার জন্য সহজ সাধ্য; আমি তো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না। যাকারিয়া (আঃ) বললো, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নিদর্শন দিন! তিনি বললেন, তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি (সুস্থাবস্থায় থাকা সত্বেও) কারো সাথে ক্রমাগত তিন দিন বাক্যালাপ করবে না। অতঃপর সে কক্ষ হতে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের নিকট আসলো ও ইঙ্গিতে তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে বললো।

আমি বললাম, হে ইয়াহইয়া (আঃ)! এই কিতাব দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করো; আমি তাকে শৈশবেই দান করেছিলাম জ্ঞান। এবং আমার নিকট হতে হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা; সে ছিল মুত্তাকী। পিতা-মাতার অনুগত এবং সে উদ্ধত (স্বেচ্ছাচারী) ও অবাধ্য ছিল না। তার প্রতি ছিল শান্তি যে দিন সে জন্ম লাভ করে, ও শান্তি থাকবে যেদিন তার মৃত্যু হবে ও যেদিন সে জীবিত অবস্থায় পুনরুজ্জীবিত হবে।

(সূরাঃ মারইয়াম: আয়াতঃ ২-১৫)

মূসা (আঃ) এবং বানী ইসরাঈল

মূসা (আঃ) এবং বানী ইসরাঈল

মহান আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,

মূসার (আঃ) এর বৃত্তান্ত তোমার কাছে পৌঁছেছে কি? সে যখন আগুন দেখলো, তখন তার পরিবারবর্গকে বললো, তোমরা এখানে থাকো, আমি আগুন দেখেছি; সম্ভবতঃ আমি তোমাদের জন্যে তা হতে কিছু জ্বলন্ত আঙ্গার আনতে পারবো অথবা ওর নিকট কোন পথ প্রদর্শক পাবো।

অতঃপর সে যখন আগুনের নিকট আসলো তখন আহ্বান করে বলা হলোঃ হে মূসা (আঃ)! আমিই তোমার প্রতিপালক, অতএব তোমার জুতা খুলে ফেল, কারন তুমি পবিত্র তুওয়া উপত্যকায় রয়েছো। এবং আমি তোমাকে মনোনিত করেছি; অতএব যা ওহী প্রেরণ করা হচ্ছে তুমি তা মনোযোগের সাথে শ্রবণ কর।

আমিই আল্লাহ্, আমি ছাড়া কোন মা'বুদ নাই; অতএব আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে নামাজ কায়েম কর। কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, আমি এটা গোপন রাখতে চাই যাতে প্রত্যেকেই নিজ কর্মানুযায়ী ফল লাভ করতে পারে। সুতরাং যে ব্যক্তি কিয়ামতে বিশ্বাস করে না ও নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, সে যেন তোমাকে তাতে বিশ্বাস স্থাপনে নিবৃত্ত না করে, নিবৃত্ত হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।

(আল্লাহ্ বলেন) হে মূসা (আঃ)! তোমার দক্ষিণ হস্তে ওটা কি? সে বললোঃ এটা আমার লাঠি; আমি এতে ভর দিই এবং এটা দ্বারা আঘাত করে আমি আমার মেষ পালের জন্যে বৃক্ষ পত্র ফেলে থাকি এবং এটা আমার অন্যান্য কাজেও লাগে।

আল্লাহ্ বললেন, হে মূসা (আঃ)! তুমি এটা নিক্ষেপ কর। অতঃপর সে তা নিক্ষেপ করলো, সাথে সাথে তা সাপ হয়ে ছুটতে লাগলো। তিনি বললেন, তুমি একে ধর, ভয় করো না, আমি একে এর পূর্ব রূপে ফিরিয়ে দিবো। এবং তুমি তোমার হাত বগলে রাখো, এটা বের হয়ে আসবে নির্মল উজ্জ্বল হয়ে অপর এক নিদর্শন স্বরূপ। এটা এই জন্যে যে, আমি তোমাকে দেখাবো আমার মহা নিদর্শনগুলোর কিছু। ফির'আউনের নিকট যাও, সে সীমালংঘন করেছে।

মূসা (আঃ) বললো, হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কর্ম সহজ করে দিন। আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন। যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। আমার জন্য করে দিন একজন সাহায্যকারী আমার স্বজনবর্গের মধ্য হতে। আমার ভাই হারুনকে (আঃ)। তার দ্বারা আমার শক্তি সুদৃঢ় করুন। এবং তাকে আমার কর্মে অংশী করুন। যাতে আমরা আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে পারি প্রচুর। এবং আপনাকে স্মরণ করতে পারি অধিক। আপনি তো আমাদের সম্যক দ্রষ্টা।

তিনি (আল্লাহ্) বললেন, হে মূসা (আঃ)! তুমি যা চেয়েছো তা তোমাকে দেয়া হলো।

এবং আমি তো তোমার প্রতি আরো একবার অনুগ্রহ করেছিলাম। যখন আমি তোমার মায়ের অন্তরে ইঙ্গিত দ্বারা নির্দেশ দিয়েছিলাম যা ছিল নির্দেশ করবার। এই মর্মে যে, তুমি তাকে সিন্ধুকের মধ্যে রাখো, অতঃপর তা দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও যাতে দরিয়া ওকে তীরে ঠেলে দেয়, ওকে আমার শত্রু ও তার শত্রু নিয়ে যাবে; আমি আমার নিকট হতে তোমার উপর ভালবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম, যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও।

যখন তোমার ভগ্নি এসে বললোঃ আমি কি তোমাদেরকে বলে দিবো কে এই শিশুর ভার নেবে? তখন আমি তোমাকে তোমার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দিলাম যাতে তার চক্ষু জুড়ায় এবং সে দুঃখ না পায়; এবং তুমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে; অতঃপর আমি তোমাকে মনোঃপীড়া হতে মুক্তি দিই, আমি তোমাকে বহু পরীক্ষা করেছি। অতঃপর তুমি কয়েক বছর মাদীয়ানবাসীদের মধ্যে ছিলে, হে মূসা (আঃ)! এর পরে তুমি নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলে।

এবং আমি তোমাকে আমার নিজের জন্য প্রস্তুত করে নিয়েছি। তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শনসমূহসহ যাত্রা শুরু কর এবং আমার স্মরণে শৈথিল্য করো না। তোমরা দু'জন ফিরাউনের নিকট যাও, সে তো সীমালংঘন করেছে। তোমরা তার সাথে নম্র কথা বলবে, হয়ত সে উপদেশ গ্রহণ করবে, অথবা ভয় করবে।

তারা বললোঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আশংকা করি যে, সে আমাদেরকে দ্রুত শাস্তি দিতে উদ্যত হবে অথবা অন্যায় আচরণে সীমালংঘন করবে।

তিনি বললেন, তোমরা ভয় করো না, আমি তো তোমাদের সঙ্গে আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি। সুতরাং তোমরা তার নিকট যাও এবং বলঃ অবশ্যই আমরা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসুল, সুতরাং আমাদের সাথে বানী ইসরাইলকে যেতে দাও এবং তাদের কষ্ট দিয়ো না, আমরা তো তোমার নিকট এনেছি তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে নিদর্শন এবং শান্তি তাদের প্রতি যারা সৎ পথের অনুসরণ করে। আমাদের প্রতি অহি প্রেরণ করা হয়েছে যে, শাস্তি তার জন্যে, যে মিথ্যা আরোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়।

ফিরআউন বললো, হে মূসা (আঃ)! কে তোমাদের প্রতিপালক?

মূসা (আঃ) বললো, আমাদের প্রতিপালক তিনি যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যোগ্য আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথ নির্দেশ করেছেন।

ফিরআউন বললো, তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কি?

মূসা (আঃ) বললো, এর জ্ঞান আমার প্রতিপালকের নিকট লিপিবদ্ধ আছে; আমার প্রতিপালক ভুল করেন না এবং বিস্মৃতও হন না।

যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করেছেন বিছানা এবং তাতে করে দিয়েছেন তোমাদের চলবার পথ, তিনি আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেন এবং তা দ্বারা বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ উৎপন্ন করেন। তোমরা আহার কর ও তোমাদের গবাদি পশু চরাও; অবশ্যই এতে নিদর্শন আছে বিবেক সম্পন্নদের জন্যে। আমি মৃত্তিকা হতে তোমাদের সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা হতে পুনর্বার বের করবো।

আমি তো তাকে আমার সমস্ত নিদর্শন দেখিয়েছিলাম; কিন্তু সে মিথ্যা আরোপ করেছে ও অমান্য করেছে। সে বললো, হে মূসা (আঃ)! তুমি কি আমাদের নিকট এসেছো তোমার যাদু দ্বারা আমাদেরকে আমাদের দেশ হতে বহিষ্কার করে দেয়ার জন্যে? আমরাও অবশ্যই তোমার নিকট উপস্থিত করবো এর অনুরূপ যাদু, সুতরাং আমাদের ও তোমার মাঝে নির্ধারণ কর এক নির্দিষ্ট সময় ও এক মধ্যবর্তী স্থান, যার ব্যতিক্রম আমরাও করবো না এবং তুমিও করবে না। মূসা (আঃ) বললো, তোমাদের নির্ধারিত সময় উৎসবের দিন এবং যেই দিন পূর্বাহ্ণে জনগণকে সমবেত করা হবে।

অতঃপর ফিরআউন উঠে গেল, এবং পরে তার কৌশলসমূহ একত্রিত করলো এবং তৎপর আসলো।

মূসা (আঃ) তাদেরকে বললো, দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করো না, করলে তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দ্বারা সমূলে ধ্বংস করবেন; যে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে সেই ব্যর্থ হয়েছে।

তারা নিজেদের মধ্যে নিজেদের কথা সম্বন্ধে বিতর্ক করলো এবং তারা গোপনে পরামর্শ করলো। তারা বললো, এই দু'জন অবশ্যই জাদুকর, তারা চায় তাদের জাদু দ্বারা তোমাদেরকে তোমাদের দেশ হতে বহিষ্কৃত করতে এবং তোমাদের উৎকৃষ্ট জীবন ব্যবস্থার অস্তিত্ব নাশ করতে। অতএব তোমরা তোমাদের যাদু ক্রিয়া সংহত কর, অতঃপর সারিবদ্ধ হয়ে উপস্তিত হও এবং যে আজ জয়ী হবে সেই সফল হবে।

তারা বললো, হে মূসা (আঃ)! হয় তুমি নিক্ষেপ কর অথবা আমরাই নিক্ষেপ করি। মূসা (আঃ) বললো, বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর; তাদের যাদুর প্রভাবে অকস্মাৎ মূসার (আঃ) মনে হলো যে, তাদের দড়ি ও লাঠিগুলি ছুটাছুটি করছে। মূসা (আঃ) তার অন্তরে কিছু ভীতি অনুভব করলো। আমি বললাম, ভয় করো না, তুমিই প্রবল। তোমার ডান হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ করো, এটা তারা যা করেছে তা গ্রাস করে ফেলবে, তারা যা করেছে তা তো শুধু জাদুকরের কৌশল; যাদুকর যেখানেই আসুক সফল হবে না।

অতঃপর যাদুকররা সিজদাবনত হলো ও বললো, আমরা হারূন (আঃ) ও মূসার (আঃ) প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনলাম।

ফিরআউন বললোঃ কী, আমি তোমাদের অনুমতি দেয়ার পূর্বেই তোমরা মূসাতে (আঃ) বিশ্বাস স্থাপন করলে! দেখছি সে তো তোমাদের প্রধান, সে তোমাদেরকে যাদু শিক্ষা দিয়েছে; সুতরাং আমি তো তোমাদের হস্তপদ বিপরীত দিক হতে কর্তন করবোই, আর তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে আমাদের মধ্যে কার শাস্তি কঠোরতর ও অধিক স্থায়ী।

তারা বললো, আমাদের নিকট যে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে তার উপর এবং যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর উপর তোমাকে কিছুতেই আমরা প্রাধান্য দিবো না, সুতরাং তুমি কর যা তুমি করতে চাও, তুমি তো শুধু এই পার্থিব জীবনের উপর কর্তৃত্ব করতে পারো। আমরা আমাদের প্রতিপালকের উপর ঈমান এনেছি যাতে তিনি ক্ষমা করেন আমাদের অপরাধ সমূহ এবং তুমি আমাদেরকে যে যাদু করতে বাধ্য করেছো তা; আর আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠ ও স্থায়ী। যে তার প্রতিপালকের নিকট অপরাধী হয়ে উপস্থিত হবে তার জন্যে তো আছে জাহান্নাম, সেথায় সে মরবেও না, বাঁচবেও না। আর যারা তাঁর নিকট উপস্থিত হবে মু'মিন অবস্থায় সৎকর্ম করে, তাদের জন্যে আছে উচ্চ মর্যাদা। স্থায়ী জান্নাত যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং এই পুরষ্কার তাদেরই যারা পবিত্র।

আমি অবশ্যই মূসার (আঃ) প্রতি প্রত্যাদেশ করেছিলাম এ মর্মে, আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রজনীযোগে বহির্গত হও এবং তাদের জন্যে সমুদ্রের মধ্য দিয়ে এক শুষ্ক পথ নির্মান কর; পশ্চাৎ হতে এসে তোমাকে ধরে ফেলা হবে এই আশংকা করো না এবং ভয়ও করো না। অতঃপর ফিরআউন সৈন্য বাহিনীসহ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলো, অতঃপর সমুদ্র তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করলো। আর ফিরআউন তার সম্প্রদায়কে পথভ্রষ্ট করেছিলো এবং সৎপথ দেখায় নাই।

হে বানী ইসরাঈল! আমি তো তোমাদেরকে তোমাদের শত্রু হতে উদ্ধার করেছিলাম, আমি তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তূর পর্বতের দক্ষিণ পার্শ্বে এবং তোমাদের নিকট মান্না ও সালাওয়া প্রেরণ করেছিলাম। তোমাদেরকে আমি যা দান করেছি তা হতে ভাল ভাল বস্তু আহার কর এবং এই বিষয়ে সীমালংঘন করো না, করলে তোমাদের উপর আমার ক্রোধ অবধারিত এবং যার উপর আমার ক্রোধ অবধারিত সে তো ধ্বংস হয়ে যায়। এবং আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল তার প্রতি, যে তওবা করে ও সৎপথে অবিচলিত থাকে।

হে মূসা (আঃ)! তোমার সম্প্রদায়কে পশ্চাতে ফেলে তোমাকে ত্বরা করতে বাধ্য করলো কিসে? সে বললো, এই তো তারা আমার পশ্চাতে এবং হে আমার প্রতিপালক! আমি ত্বরায় আপনার নিকট আসলাম, আপনি সন্তুষ্ট হবেন এই জন্যে। তিনি বললেন, আমি তোমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় ফেলেছি তোমার চলে আসার পর এবং সামেরী তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।

অতঃপর মূসা (আঃ) তার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে গেল ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে; সে বললো, হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদেরকে এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেন নাই? তবে কি প্রতিশ্রুত কাল তোমাদের নিকট সূদীর্ঘ হয়েছে, না তোমরা চেয়েছো তোমাদের প্রতি আপতিত হোক তোমাদের প্রতিপালকের ক্রোধ, যে কারণে তোমরা আমার প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে?

তারা বললো, আমরা তোমার প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করি নাই; তবে আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল লোকের অলংকারের বোঝা এবং আমরা তা অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করি, অনুরূপভাবে সামেরীও নিক্ষেপ করে। অতঃপর সে তাদের জন্যে গড়লো এক গো-বৎস, এক আবয়ব, যা হাম্বা রব করতো; তারা বললো, এটা তোমাদের মা'বুদ এবং মূসার (আঃ) মা'বুদ কিন্তু মূসা (আঃ) ভুলে গেছে।

তবে কি তারা ভেবে দেখে না যে, ওটা তাদের কথায় সাড়া দেয় না এবং তাদের কোন ক্ষতি অথবা উপকার করবার ক্ষমতাও রাখে না?

হারূন (আঃ) তাদেরকে পূর্বেই বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! এটা দ্বারা তো শুধু তোমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে; তোমাদের প্রতিপালক দয়াময়, সুতরাং তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মেনে চল। তারা বলেছিল, আমাদের নিকট মূসা (আঃ) ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এর পূজা হতে কিছুতেই বিরত হবো না।

মূসা (আঃ) বললো, হে হারূন (আঃ)! তুমি যখন দেখলে যে, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করলো আমার অনুসরণ হতে? তবে কি তুমি আমার আদেশ অমান্য করলে? হারূন (আঃ) বললো, হে আমার সহোদর! আমার দাড়ি ও কেশ ধরে আকর্ষণ করো না; আমি আশংকা করেছিলাম যে, তুমি বলবেঃ তুমি বানী ইসরাঈলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছো ও আমার বাক্য পালনে যত্নবান হও নাই।

মূসা (আঃ) বললো, হে সামেরী! তোমার ব্যাপার কি? সে বললোঃ আমি দেখেছিলাম যা তারা দেখে নাই; অতঃপর আমি সেই দূতের (জিবরাঈলের) পদচিহ্ন হতে একমুষ্টি (ধূলা) নিয়েছিলাম এবং আমি তা নিক্ষেপ করেছিলাম, আর আমার মন আমার জন্যে শোভন করেছিল এইরূপ করা।

মূসা (আঃ) বললো, দূর হও, তোমার জীবদ্দশায় তোমার জন্যে এটাই রইলো যে, তুমি বলবেঃ আমি অস্পৃশ্য (আমাকে স্পর্শ করবে না) এবং তোমার জন্যে রইলো এক নির্দিষ্ট কাল, তোমার বেলায় যার ব্যতিক্রম হবে না এবং তুমি তোমার সেই মা'বূদের প্রতি লক্ষ্য কর যার পূজায় তুমি রত ছিলে; আমরা ওকে জ্বালিয়ে দিবই, অতঃপর ওকে বিক্ষিপ্ত করে সাগরে নিক্ষেপ করবই। আমাদের মা'বূদ তো শুধুমাত্র আল্লাহই যিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) মা'বূদ নাই, তাঁর জ্ঞান সর্ববিষয়ে ব্যাপ্ত।

পূর্বে যা ঘটেছে তার সংবাদ আমি এভাবে তোমাদের নিকট বিবৃত করি এবং আমি আমার নিকট হতে তোমাকে দান করেছি উপদেশ। এটা হতে যে বিমুখ হবে সে কেয়ামতের দিনে মহা ভার বহন করবে। তাতে তারা স্থায়ী হবে এবং কিয়ামতের দিন এই বোঝা তাদের জন্যে কত মন্দ!

(সূরাঃ ত্বা-হা: আয়াতঃ ৯-১০১)

কারূনের সম্পদ প্রথিত হওয়া

কারূনের সম্পদ প্রথিত হওয়া

বনী ইসরাঈল সমূদ্র পার হবার পর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব হযরত মূসা (আঃ) ও হারূন (আঃ) উপর ন্যস্ত ছিল। এবং হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় ভ্রাতা হযরত হারূন (আঃ) কে বাইতুল কুরবান তথা কোরবানি ও উৎসর্গীত দ্রব্যের তত্ত্বাবধায়ক নির্ধারণ করলেন, অর্থাৎ আল্লাহর রাহে উৎসর্গের জন্য যে সব সামগ্রী আসবে, তা হযরত হারূন (আঃ) এর মারফত কুরবানগাহে রাখা হবে। সে সময় আসমানী আগুন এসে তা পুড়িয়ে ফেলতো। আর এটাই ছিল কোরবানি ও নজর- নেওয়াজ আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার নিদর্শন। এ বিষয়ে কারূনের হিংসা হল। সে বলল, আপনি নবীও আবার কওমের সরদারও, আর হারূন কুরবানগাহ’ এর তত্ত্বাবধায়ক হবে; কিন্ত কোন বিষয়ে আমার কোন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকবে না, তা কি করে সহ্য করা যায়? অথচ আমি তাওরাতের হাফেজ ও আলেম! হযরত মূসা (আঃ) বললেন এটা আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকেই নির্ধারিত, এ বিষয়ে আমার কোন কর্তৃত্ব নেই। আলস্নাহর পক্ষ থেকেই এই সিদ্ধান্ত্ম হয়েছে। কারূন তখন বলল, এটা অবশ্যই জাদু বলে ঘটেছে। এই কথার পর বনী ইসরাঈলের অনেক সর্দারকে বিভিন্ন প্রলোভন এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সে তার দল ভুক্ত করে নিল। এভাবেই উভয়ের মধ্যে সংঘাত শুরম্ন হলো।

এরপর আল্লাহ তা’য়ালা যখন যাকাত ওয়াজিব করলেন, তখন মূসা (আঃ) কারূনের নিকট এসে প্রতি হাজারে এক দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) যাকাত তলব করলেন। কারূন হিসাব করে দেখল, এতে তার প্রচুর অর্থ হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে সে চিন্তিত হয়ে বনী ইসরাঈলকে একত্র করে বলল, এতদিন যাবত মূসা যা বলেছেন, তা তোমরা মেনে নিয়েছ। কিন্তু সে তাতে সন্তষ্ট হয়নি। এখন সে তোমাদের মাল সম্পদ গ্রাস করার ফন্দি করছে। লোকজন বলল, আপনি আমাদের সর্দার, জ্ঞানী গুণী ও বুদ্ধিমান। সুতরাং আপনি যা বলেন আমরা তা মেনে নিতে প্রস্তত আছি।

কারূন নির্দেশ দিল যে, অমুক ব্যভিচারিণীকে নিয়ে এসো, তাকে তার চাহিদা মতো অর্থ সম্পদ দিয়ে তাকে একথা বলতে সম্মত করো যে, সে মূসার উপর তার সঙ্গে ব্যভিচারের অভিযোগ তুলবে। লোকজন যখন একথা শুনবে, তখন তার থেকে দূরে সরে যাবে, এবং তাঁর বিদ্রোহী হয়ে যাবে। ফলে আমাদের সবার জন্য তার গোলামী থেকে নিষ্কৃতি মিলবে। নরাধম কারূনের নির্দেশ মতে উক্ত ব্যভিচারিণীকে নিয়ে আসা হলো। তাকে প্রচুর অর্থের প্রলোভন দিয়ে এ বিষয়ে সম্মত করা হলো। কারূন এবং তার লোকজন বনী ইসরাঈলকে সমবেত করে মূসা (আঃ) এর নিকট গেল এবং বলল, এসব লোকজন সমবেতদ হয়েছে এদের উদ্দেশ্যে কিছু ওয়াজ-নছিহত করুন। হযরত মূসা (আঃ) বাইরে এসে ওয়াজ নছিহত শুরু করলেন। ওয়াজের মধ্যে শরীয়তের বিভিন্ন বিধি সম্পর্কে আলোকপাত করলেন। তার মধ্যে চোরের সাজা হস্ত কর্তন, ব্যভিচারের অপবাদ আরোপের সাজা ৮০ কোড়া, এবং ব্যভিচারী বিবাহিত ও সুস্থ বিবেকসম্পন্ন না হলে ১০০ কোড়া, আর বিবাহিত ও সুস্থ মস্তিস্ক সম্পন্ন হলে তাকে ‘সঙ্গেসার’ অর্থাৎ পাথর মেরে জীবনপাত করার বিধানও উল্লেখ করলেন। এ সময় কারূন দাঁড়িয়ে বলে উঠল, এ অপকর্ম যদি আপনি করেন তাহলে তার সাজা কি হবে? তিনি বললেন আল্লাহর বিধান সবার জন্য সমান। কারূন তখন বলল, আপনি অমুক মহিলার সাথে ব্যভিচার করেছেন। হযরত মূসা (আঃ) বললেন, তাকে ডেকে নিয়ে এসো ! যদি সে স্বীকার করে তাহলে সত্য হবে। সুতরাং উক্ত মহিলাকে হাজির করা হলো, হযরত মূসা (আঃ) তাকে বললেন, হে মহিলা ! সত্যিই কি আমি তোমার সাথে কখনো এ অপকর্ম করেছি, যা এরা বলেছে? আমি তোমাকে সেই সত্তার দোহাই দিচ্ছি, যিনি বনী ইসরাঈলেন জন্য সমুদ্রে রাস্তা করে দিয়ে ছিলেন এবং তাওরাত নাজিল করেছিলেন ! তুমি ঠিক ঠিক বলবে। উক্ত মহিলা তখন তাদের শিখানো কথা ভুলে গেল এবং বলল, এরা মিথ্যবাদী। কারূন আমাকে এ পরিমান অর্থ দিয়ে আপনার উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করতে বলেছিল। কারূন একথা শ্রবণে চিন্তাগ্রস্থ হয়ে গেল। এবং মাথা নিচু করে ফেলল। অন্যান্য নেতারা নিশ্চুপ হয়ে গেল। সবাই তখন আল্লাহর আজাবের ভয়ে ভীত হয়ে গেল। হযরত মূসা (আঃ) সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। কেঁদে কেঁদে আরজ করলেন, হে আমার পরওয়ারদেগার! এ দুশমন আমাকে যথেষ্ট পরিমাণ কষ্ট দিয়েছে। আমাকে সে লাঞ্ছিত অপমানিত করতে চেয়েছে। যদি আমি সত্য রাসূল হয়ে থাকি, তাহলে আমাকে তার উপর ক্ষমতাবান কর। আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে ওহী এলো, হে মূসা! মাথা উত্তোলন কর এবং জমিনকে নির্দেশ দাও যা তুমি চাও, সে তা পালন করবে। সুতরাং হযরত মূসা (আঃ) জমিন কে নির্দেশ দিলেন যে, কারূনকে গ্রাস করে নাও! সাথে সাথে মাটি কারূনকে গ্রাস করতে শুরু করল। আস্তে আস্তে সে মাটির মধ্যে দেবে যেতে লাগল। কারূন ‘মূসা! মূসা!’ বলে চিৎকার শুরু করল। অপরিসীম কান্নাকাটি করতে লাগল। এমনকি সে ৭০ বার মূসা বলে ডাকল। কিন্ত তার ডাকে কোনো উপকার হলো না। অবশেষে সে মাটির অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল।

এ ঘটনার পর বনী ইসরাঈলের কতিপয় লোক মন্তব্য করল যে, হযরত মূসা (আঃ) কারূনের সম্পদ লাভ করার জন্য তাকে মাটির মধ্যে ধ্বসিয়ে দিয়েছেন। একথা জানতে পেরে তিনি আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে দোয়া করলেন, হে আমার প্রভু কারূনের ধন ভান্ডারকেও মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দাও। ফলে তার সমস্ত ধন ভান্ডারও মাটির নিচে ধ্বসে গেল। আর এ ধ্বস কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

হযরত মূসা (আঃ)-এর মাদইয়ানে উপস্থিতি ও শোআইব (আঃ) এর গৃহে আশ্রয় লাভ

হযরত মূসা (আঃ)-এর মাদইয়ানে উপস্থিতি ও শোআইব (আঃ) এর গৃহে আশ্রয় লাভ

প্রচন্ড গরম, উত্তপ্ত বালুকাময় পথ সহ্য করে হযরত মূসা (আঃ) মিশর থেকে মাদইয়ানে পৌঁছেছেন। এখন তিনি ফিরআউনী শত্রু কর্তৃক ধৃত হবার দূর্ভাবনা মুক্ত, কিন্তু তিনি তখনও অবহিত হতে পারেন নাই যে, তিনি মাদইয়ানে উপনীত হয়েছেন। দীর্ঘ পথ চলার ক্লান্তি জনিত অবসান্নতা, তদুপরি ক্ষুধা-তৃষ্ণা, সব মিলিয়ে তিনি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন। তাই দৈহিক অবসাদ অবসন্নতা দূরীকরণার্থে তিনি এক বৃক্ষের ছায়ার অবস্থান গ্রহণ করেন। বৃক্ষের অদূরেই একটি পানির কুয়া রয়েছে। তিনি দেখলেন, অনেক লোক স্ব স্ব পশুকে পানি পান করানোর উদ্দেশে সেখানে একত্র হয়েছে। একে একে সবাই নিজ নিজ পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে যাচ্ছে। দুইটি মেয়েও কয়েকটি পশু নিয়ে এনেছিলো পানি পান করানোর জন্য, কিন্ত তারা রাখাল দলের ভিড় এড়িয়ে দূরে দাড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে এরা অভিজাত নন্দিনী। তাই কুপের পাড়ে এসে রাখাল ছেলেদের সাথে তালগোলে এক সাথে নিজেদের পশুগুলোকে পানি পান করানো তাদের জন্য সম্ভব হয়ে উঠছে না। তিনি বৃক্ষেত ছায়ার উপবেশন করে মেয়ে দুইটির অবস্থা সচকিত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু তাদের পশুগুলো বার বার পানির প্রতি ধাবমান হচ্ছে আর তারা সেগুলোকে ফিরিয়ে রাখছে। কুপের পাড়ে আগত এ দুইটি মেয়ে হযরত শোয়াইব (আঃ) এর কন্যা। শোয়াইব (আঃ) এ সময় বয়সের ভারে ন্যূব্জ। তাঁর কোন পুত্র সন্তান ছিল না। তদুপরি তার পরিবারে এমন কোন পুরুষ লোকও ছিলো না যে, ঘর গৃহস্থালীর এসব কাজ করতে পারে। বয়সের কারনে তিনি নিজেও এসব কাজে অক্ষম। তাই একান্ত বাধ্য হয়েই তাঁর কন্যাদ্বয়ের ঘর গৃহস্থলীর কাজ করতে হয়। শোয়াইব (আঃ) এর কন্যাদ্বয়ের বড় জনের নাম সফুরা আর ছোট জনের নাম সগূরা বলে জানা যায়। পরবর্তীতে সফূরা মূসা (আঃ) এর পত্নিতেবরিত হন। মূসা (আঃ) এগিয়ে গিয়ে বোনদ্বয়কে অপেক্ষার কারন জিজ্ঞাসা করলে তারা নিজেদের পারিবারিক অবস্থা বিবৃত করে বলল, পুরুষের ভিড় ঠেলে কাজ করা আমাদের পছন্দনীয় নয়। একান্ত বাধ্য হয়েই আমরা এখানে এসেছি। পরিবারে সক্ষম কোন পুরম্নষ মানুষ থাকলে আমরা আসতাম না। এখন আমরা রাখালদের প্রস্থানের অপেক্ষা করছি। প্রতিদিন আমরা তাই করে থাকি। তারা চলে গেলেই আমাদের পশুগুলোকে পানি পান করাই। তাদের কথাবার্তা শুনে তারা যে অভিজাত বংশের নন্দিনী, এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হন এবং তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন। তিনি রাখালদের ভিড় ঠেলে তাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে দিয়ে পুনরায় বৃক্ষের ছায়ায় গিয়ে উপবেশন করেন। কন্যাদ্বয় স্বগৃহ অভিমুখে চলে যায়। মাদইয়ানের কূপের নিকট উপনীত হওয়া এবং শোআইব (আঃ) এর কন্যাদ্বয়ের পশুগুলোকে পানি পান করানো, তাদের সাথে কথোপকথন ইত্যাদি সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালা কোরাআন মাজিদে বলেন-
ولما ورد ماء مدين وجد عليه امة من الناس يسقون ووجد من دونهم امراتين تذودان قال ماخطبكما قالتا لانسقي حتي يصدر الرعاء وابونا شيخ كبير.
অর্থঃ আর যখন তিনি মাদইয়ানের পানির কূপের নিকট উপনীত হলেন, তখন এক দল লোক দেখতে পেলেন যারা (নিজ নিজ পশুকে) পানি পান করাচ্ছে, আর তাদের পিছনে দুই জন স্ত্রীলোককে দাঁড়ানো দেখলেন, তিনি (মূসা আঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের উদ্দেশ্য কি? তারা বলল, যে যাবত এ রাখাল দল (তাদের পশুগুলোকে) পানি পান করিয়ে দূরে সরে না যাবে, ততক্ষন আমরা পানি পান করাবো না। আর আমাদের পিতা অতিশয় বৃদ্ধ। [সূরাঃ কাসাস, আয়াতঃ ২৩]

পশুগুলোকে পানি পান করাতে এসে শোয়াইব (আঃ) এর কন্যাদ্বয়ের অপেক্ষার কারণ সম্পর্কে আরেকটি বনর্ণাও রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, যেদিন হযরত মূসা (আঃ) মাদইয়ানের কূপের পাড়ে উপনীত হন, সেদিন শোয়ইব (আঃ) এর কন্যাদ্বয়কে রাখালদের ভীড়ের সাথে সাথে আরেকটি কারণেও তথায় অপেক্ষা করতে হয়েছে। তা হচ্ছে, রাখালরা নিজেদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে যাবার সময় কূপের মুখে পাথর চাপা দিয়ে যায়। এ পাথরটি ছিল অত্যন্ত ভারী। এটি সরাতে চল্লিশ জন লোকের প্রয়োজন পড়তো। আর যে ডোল দিয়ে পানি উঠাতে হত সেটিও অত্যন্ত্ম ভারী ছিল বিধায় রাখালদের চলে যাবার পরও শোয়াইব (আঃ) এর কন্যাদ্বয়কে কূপ রক্ষীদের আগমণের অপেক্ষা করতে হয়েছে। তারা এলে কূপের মুখের পাথর সরাবে এবং ডোল দিয়ে পানি উঠিয়ে দিবে, তবেই তারা নিজেদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে ঘরে ফিরে যাবে। মুসা (আঃ) দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে অপেক্ষারত দেখে কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা রাখালদের ভীড়, কূপের পাথর এবং ভারী ডোল দিয়ে পানি উঠাতে না পারার কথা ব্যক্ত করে। তাদের কথা শুনে মূসা (আঃ) একাই কূপের মুখের পাথর তুলে পানি উঠিয়ে দেন এবং কন্যাদ্বয় পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে গৃহঅভিমুখে ফিরে যায়। মেয়ে দু’টি চলে যার মুসা (আঃ) পুনরায় বৃÿ ছায়ায় গিয়ে বসে পড়েন। এসময় তাঁর ক্ষুধা তৃষ্ণা এবং দৈহিক অক্ষমতা অবসাদগ্রস্থতা তীব্রভাবে অনুভূত হতে থাকে। এ সম্পর্কে আলস্নাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন-
فسقي لهما ثم تولي الي الظل فقال رب اني لما انزلت الي من خير فقير-
অর্থঃ অনন্তর মুসা (আঃ) তাদের (শোয়াইব (আঃ) এর কন্যাদ্বয়ের) পশুগুলোকে পানি পান করালেন, অতঃপর (তথা হতে) সরে গিয়ে ছায়ায় বসলেন। তখন দোয়া করলেন, হে আমার রব! আমার প্রতি আপনি যে নেয়ামত পাঠান আমি তার মুখাপেক্ষী। -(সুরাঃ কাসাস, আয়াতঃ ২৪)

মুসা (আঃ) শোয়াইব (আঃ) এর কন্যাদ্বয়ের পশুগুলোকে পানি উঠিয়ে দেবার পর তারা কোন প্রকার কথাবার্তা ছাড়াই চলে গেলেও মূসা (আঃ)- এর নৈতিক শুচি শুদ্ধতা, মার্জিত আচরণ, চলন-বলন, অনন্য দৈহিক শক্তি সামর্থ্য ইত্যাদি গুণ-বৈশিষ্ট্য তাদের দৃষ্টি এড়াতে পারে নাই। কারণ, তারা পাথর সরানো, ডোল বয়ে পানি উঠানোতে দৈহিক শক্তিমত্তা এবং তাদের কথাবার্তায় নৈতিক শুচি শুদ্ধতার স্বাক্ষর পেয়েছেন। ঘরে ফিরেও দুই বোন এ অপরিচিত যুবকের মাঝে পরিদৃষ্ট গুণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাপ আলোচনা করেছিলেন। তাদের কথার আওয়াজ হযরত শোয়ইব (আঃ)- এর কর্ণগোচর হয়। কেননা, অন্য দিন তারা এত দ্রুত ঘরে ফিরতে পারে না। আজকে কি করে সম্ভব হলো তা জিজ্ঞাসা করেন। তারা পিতার কাছে ঘটনা সবিস্তারে বিবৃত করল। তারা এও বলল, যুবকটি অতুল দৈহিক শক্তি ও সুঠাম দেহের অধিকারী, পুণ্যবান ও আমানতদার। সুতরাং আমাদের মনে হয়, এ যুবক কে আমাদের ঘর গৃহস্থলীর কাজের জন্য রেখে দিলে ভাল হবে। কারণ, যে কোন কাজ সূক্ষভাবে সমাধার জন্য দৈহিক শক্তিমত্তা এবং আমানতদারি- এ দুটি গুণ বৈশিষ্ট্যই সর্বাধিক প্রয়োজন। হযরত শোয়াইব (আঃ)ও ঘর গৃহস্থলীর কাজ সুষ্ঠভাবে সমাধার জন্য দৈহিক শক্তিমত্তার অধিকারী একজন আমানতদার লোকের প্রয়োজন অনুভব করছিলেন। কন্যাদ্বয়ের নিকট যুবকের কথা জানতে পেরে তিনি তাকে ডেকে আনার জন্য কন্যা ‘সফুরা’ কে পাঠান। শোয়াইব (আঃ) এর কন্যা সফুরা অতি সংযত ভাবে, বেশবাসে সমকালে প্রচলিত পর্দারীতি রক্ষা করে মূসা (আঃ)- কে ডেকে আনার উদ্দেশে গমন করেন। এ সম্পর্কে আলস্নাহ তা’য়ালা কোরআন মাজিদে ইরশাদ করেন-
فجاءته احداهما تمشي علي استحياء قالت ان ابي يدعوك ليجزيك اجرما سقيت لنا-
অর্থঃ তখন কন্যাদ্বয়েন একজন সলজ্জভাবে চলতে চলতে এলো, সে বলল, আমার আব্বা আপনাকে ডাকছেন, আপনি যে পানি পান করিয়ে দিয়েছেন তার বিনিময় প্রদানের জন্য।

মেয়েকে পাঠানোর সময় হযরত শোয়াইব (আঃ) পানি পান করানোর বিনিময় প্রদানের উদ্দেশে মূসা (আঃ) কে ডেকে পাঠান নাই। বিনিময় প্রদান করতে ডেকেছেন- এটা শোয়াইব (আঃ) এর কন্যার অনুমাননির্ভর উক্তি। কারণ, তারা যখন মূসা (আঃ)- কে কর্মে নিযুক্ত করার প্রস্তাব করেছিলেন, তখন শোয়াইব (আঃ) এ প্রস্তাবের প্রতি কোন প্রকার সম্মতি প্রকাশ করে নাই। তাই কন্যা অনুমান করেছে, সম্ভবত আব্বা এ যুবককে পানি পান করানোর বিনিময় প্রদানের উদ্দেশ্যেই ডেকে পাঠিয়েছেন। কেননা, কন্যারা আগে থেকেই দেখে আসছেন, তাঁদের আব্বা কারো দ্বারা ন্যূনতম কোন কাজ করালেও বা কেউ নিজের থেকে কোন সাহায্য সহায়তা করলে তিনি তার বিনিময় প্রদান করেন। পিতার আচরিত রীতিই কন্যাকে বিনিময় প্রদানের কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু মূসা (আঃ) বিনিময় প্রদানের কথা শুনে ভাবনায় পড়ে যান। কারণ, তিনি তো কোন বিনিময় লাভের আশায় কন্যাদ্বয়কে সহায়তা করেন নাই। বরং মানবিক দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র। আর মানবিক দায়িত্ব পালন করে বিনিময় গ্রহণ করা কোন ভদ্র মানুষের রীতি হতে পারে না। অন্য দিকে একজন বৃদ্ধ সন্মানিত মানুষের আহবান প্রত্যাখ্যান করাও অসমীচীন। এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে তিনি শোয়াইব (আঃ) এর কন্যার সাথে গমন করেন। যেহেতু মূসা (আঃ) এখানে অপরিচিত মানুষ, পথঘাট তাঁর অজানা অচেনা, তাই শোয়াইব (আঃ) এর কন্যা তাঁকে পথ দেখিয়ে নেওয়ার উদ্দেশে আগে চলতে চাইলেন। মূসা (আঃ) ভাবলেন, উঠতি বয়সের একটি মেয়ে সামনে দিয়ে পথ চলতে থাকলে তার প্রতি দৃষ্টি পতিত হওয়াই স্বাভাবিক, এতে নৈতিকতা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাই তিনি বললেন, বোন! তুমি পেছনে থেকে আমাকে পথ দেখাতে থাক। আমি ভুল পথে চলে গেলে তুমি আমাকে পথনির্দেশ করো। এভাবে শোয়াইব (আঃ) এর কন্যাকে পেছনে রেখে তার মৌখিক নির্দেশে মূসা (আঃ) শোয়াইব (আঃ) এর আবাস্থলে পৌছে যান।

শোয়াইব (আঃ) এর বাড়ীতে পৌঁছার পর তিনি মূসা (আঃ)-কে খেতে আহবান করেন। এ আহবানের জবাবে মূসা (আঃ) বললেন, আলস্নাহ আপনার ভালো করম্নন। তাঁর এ কথা বলার উদ্দেশ্য, তিনি মানবিক সাহায্য দানের বিনিময় স্বর‍্যপ কিছু গ্রহণ করতে সম্মত নন। শোয়াইব (আঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, কেন খাবে না, তুমি কি ক্ষুধার্ত নও। মূসা (আঃ) বললেন, আমি অবশ্যই ক্ষুধার্ত এবং তা খুব বেশী রকমেই। কিন্তু কাউকে কোন মানবিক সাহায্য দানের বিনিময়ে পৃথিবী পূর্ণ স্বর্ণ হলেও আমি তা গ্রহণে প্রস্তুত নই। কেননা, মানবিক সাহায্য সহায়ত প্রদান আখেরাতের আমল। আর আমি এমন এক বংশধারার সন্তান, যারা কোন মূল্যেই আখেরাতের কোন আমল বিক্রি করতে রাজি নয়। এবার শোয়াইব (আঃ) বললেন, তোমাকে খাওয়ানো কোন কিছুর বিনিময়ে নয়, বরং অতিথিপরায়ণতা আমার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। তাই আমি অতিথি অভ্যাগতদেরকে আহার করিয়ে থাকি। সুতরাং তুমি যে কারণে শংকিত হয়ে খেতে অস্বীকার করছ, এখানে এমন কোন কারণ অনুপস্থিত। শোয়াইব (আঃ) এর উত্তর শুনে মূসা (আঃ) তাঁর সাথে খেতে বসে যান। খাওয়া শেষে হযরত শোয়াইব (আঃ) তাঁর নাম, পারিবারিক সমগ্র অবস্থা এবং কেনই বা তাঁর মাদইয়ানে আসা ইত্যাদি বিষয় জিজ্ঞাসা করলেন। মূসা (আঃ) তাঁর নিকট মাদইয়ানে উপনীত হওয়ার কারণসহ সব ঘটনা বর্ণনা করেন। তার বর্ণনা শুনে শোয়াইব (আঃ) তাঁকে অভয় দান করেন। কোরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
فلما جاءه وقص عليه القصص قال لاتخف نجوت من القوم الظالمين
অর্থঃ অতঃপর মূসা যখন তাঁর নিকট আসলেন এবং সমগ্র অবস্থা বিবৃত করলেন, তখন তিনি বললেন, ভীত হয়ো না। তুমি জালেমদের থেকে রক্ষা পেয়েছ। (সূরা কাসাস, আয়াত ২৫)

শোয়াইব (আঃ) হযরত মূসা (আঃ) -কে সান্তনা ও অভয় দিয়ে বললেন, এখন তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ। ভয়ের কারণ নাই। কারণ তুমি ফেরআউনের রাজত্বাধীন এলাকার বাইরে এসে গেছ। এখানে ফেরআউনের রাজকীয় কর্তৃত্বের কোন কার্যকারিতা নাই, তাই তোমারও শংকিত থাকার কোন কারণ নাই। শোয়াইব (আঃ) এর কন্যাদ্বয় পর্দার আড়ালে তাদের পিতাও ভীন দেশী যুবকের কথোপকথন শুনছিলেন। কন্যাদ্বয়ের মধ্য থেকে সফুরা পিতাকে বলল, আব্বা! এ যুবককে আমাদের সাংসারিক কাজকর্মের জন্য রেখে দিন। কেননা, এ যুবক দৈহিক শক্তিমত্তার অধিকারী এবং আমানতদার। আর সাংসারিক কাজকর্মে এমন ধরনের লোকেরই প্রয়োজন। এ সম্পর্কে আলস্নাহ তা’য়ালা কোরআন মাজীদে ইরশাদ করেন-
قالت احداهما يابت استاجره ان خير من استاجرت القوي الامين
অর্থঃ কন্যদ্বয়ের একজন বলল, আব্বা! আপনি তাঁকে কর্মচারী রাখুন, কেননা, সে উত্তম কর্মচারী ও শক্তিশালী এবং আমানতদার। (সুরা কাসাস, আয়াত ২৬)।

কন্যার এ প্রস্তাবে শোয়াইব (আঃ) বুঝে ফেললেন, ভিন দেশী অপরিচিত এ যুবক তাঁর কন্যাদ্বয়ের কাছে পছন্দনীয়। কারণ, মানুষের সাধারণ প্রকৃতি হচ্ছে- অপছন্দনীয় কোন লোকের প্রশংসা করে না। এক্ষেত্রে তাঁর কন্যাদ্বয় এ যুবকের দৈহিক শক্তিমত্তা ও আমানতদারী প্রশংসা করছে। তিনি কন্যার কাছে জানতে চাইলেন, তোমরা তাঁর আমানতদারী গুণের পরিচয় পেলে কি করে। শক্তিমত্তার পরিচয় তো পেয়েছ তোমাদের পশুগুলোকে কুপ থেকে পানি পান করানোর মাধ্যমে। কিন্তু আমানতদারী গুণের পরিচয় তো তোমাদের পাবার কথা নয়। কন্যাদ্বয় উত্তর দিলো, পানি পান করানোর সময় এবং আপনার আহবানে আমাদের ঘরে আসার সময় পথিমধ্যে আচার-আচরণ চলন বলনে আমরা তাঁর আমানতদারী গুণের পরিচয় লাভ করেছি। শোয়াইব (আঃ) কন্যাদ্বয়ের যুক্তি স্বীকার করেন। যুবক মূসা (আঃ) সম্পর্কিত কন্যাদ্বয়ের কথাবার্তায় আশ্বস্ত হয়ে হযরত শোয়াইব (আঃ)- এর আস্থা হল, আমি যদি কন্যাদ্বয়ের কাউকে এ যুবকের নিকট বিয়ে দেবার প্রস্তাব করি তাহলে সে অমত করবে না। তাঁর এরূপ আস্থার ভিত্তি স্থল-তার কন্যাদ্বয় যখন যুবককে কর্মচারী রাখার প্রস্ত্মাব করে, তখন সে তা অস্বীকার করে নাই। সুতরাং কন্যা দানের প্রস্তাব কর্মে নিযুক্ত করার প্রস্তাবের চাইতে উত্তম। তাই তাঁর অস্বীকৃত হবার কথা নয়। অতএব, শোয়াইব (আঃ) ভিন দেশী অপরিচিত যুবক মূসা (আঃ)- এর নিকট সরাসরি নিজের কন্যাকে বিয়ে দেবার প্রস্তাব দেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়াল ইরশাদ করেন-
قال اني اريد ان انكحك احدي ابنتي هاتين علي ان تاجرني ثمني حجج فان اتممت عشرا فمن عندك وما اريد ان اشق عليك ستجدني ان شاء الله من الصالحين-
অর্থঃ তিনি (শোয়াইব (আঃ) তাকে (মূসা (আঃ) কে বললেন, আমি আমার এই কন্যাদ্বয়ের একজন কে তোমার সাথে বিয়ে দিতে ইচ্ছা করি- শর্ত হলো, তুমি আট বছর আমার চাকরি করবে (এটা বিয়ের মহরানা), অতঃপর তুমি যদি দশ বছর পূর্ণ কর তবে তা তোমার পক্ষ হতে (অনুগ্রহ) হবে, আর আমি তোমার উপর কোন চাপ প্রয়োগ করতে ইচ্ছা করি না; আল্লাহর ইচ্ছায় তুমি আমাকে সদাচারী পাবে। (সূরা কাসাস, আয়াত ২৭)
হযরত মূসা (আঃ) শোয়াইব (আঃ) এর প্রস্তাব গ্রহণ করে বললেন-
قال ذالك بيني و بينك ايما الاجلين قضيت فلا عدوان علي والله علي ما نقول و كيل-
অর্থঃ তিনি (মূসা (আঃ)) বললেন, আমারও আপনার মাঝে এটাই সিদ্ধান্ত; এ দুই মেয়াদের যেটাই পূর্ণ করি, আমার প্রতি কোন বাধ্যবাধকতা থাকবে না। আর আমরা যা বলছি, আল্লাহই এর সাক্ষীরূপে যথেষ্ট। -(সূরা কাসাস, আয়াত ২৮)
হযরত শোয়াইব (আঃ) এর সাথে চুক্তি মোতাবেক মূসা (আঃ) আট বছর পর্যন্ত তাঁর কর্মে নিযুক্ত থাকেন। এমনকি যে দুই বছর ইচ্ছাধীন ছিল তাও পূরণ করেন। এতে পুরা দশ বছরই তিনি শোয়াইব (আঃ) এর কর্মে নিযুক্ত থাকেন। আর শোয়াইব (আঃ)ও চুক্তির শর্তানুযায়ী কন্যা সফুরাকে হযরত মূসা (আঃ) এর নিকট বিয়ে দেন। চুক্তির বাধ্যবাধকতা আট বছর ও ইচ্ছাধীন দুই বছর মোট দশ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করার পর হযরত মূসা (আঃ) শোয়াইব (আঃ) এর সমীপে নিবেদন করলেন, তিনি মিসরে অবস্থিত তাঁর মা ও বোনের সাথে দেখা করতে যেতে চান। হযরত শোয়াইব (আঃ) তাঁকে সস্ত্রীক মিসর গমনের অনুমতি প্রদান করেন। বিদায় কালে একটি লাঠি হাতে তুলে দেন। কথিত আছে, এ লাঠি হযরত আদম (আঃ) জান্নাত থেকে সঙ্গে করে আনেন এবং আদম (আঃ) এর হাত থেকে অনেক নবী রাসূলের হাত বদল হয়ে অবশেষে হযরত শোয়াইব (আঃ) এর হাতে পৌছে। আদম (আঃ) কর্তৃক জান্নাত হতে আনীত লাঠিই শোয়াইব (আঃ) মিসর অভিমুখে বিদায়কালে হযরত মূসা (আঃ) কে প্রদান করেন। আর এই লাঠি দিয়েই মূসা (আঃ) ফেরআউনের জাদুকরদের সাথে বিজয় হয়েছেন।