Showing posts with label ঈদ ও কুরবানীর মাসয়ালা. Show all posts
Showing posts with label ঈদ ও কুরবানীর মাসয়ালা. Show all posts

Saturday, December 17, 2016

ঈদুল আয্হার তাৎপর্য ও কুরবানীর ইতিহাস

ঈদুল আয্হার তাৎপর্য ও কুরবানীর ইতিহাস

কুরবানীর বিধান আল্লাহ প্রদত্ত সকল শরীয়তেই বিদ্যমান ছিল
কুরবানীর ইতিহাস ততোটাই প্রাচীন যতোটা প্রাচীন মানব অথবা ধর্মের ইতিহাস। আল্লাহ পুরস্তির কুরবানী নামক এ মহান নিদর্শন মানব জাতির প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত সকল শরীয়তেই কার্যকর ছিলো। সকল নবীর উম্মতকেই কুরবানী করতে হয়েছে। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের এ ছিল একটা অপরিহার্য অংশ। আল্লাহতায়ালার এ বিধান মানব জাতির সৃষ্টি লগ্ন থেকেই কার্যকর হয়ে আসছে ।
মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস এটাই সাক্ষ্য দেয় যে, পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোন না কোন ভাবে আল্লাহর দরবারে নিজেদের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করে । এটাই মানুষের চিরন্তন স্বভাব বা ফিতরাত।
এ ফিতরাতের স্বীকৃতি প্রদান করে মহান আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করেছেনঃ
وَلِـكُلِّ اُمَّةٍ جَعَـلْـنَا مَنْسَكًا لِّـيَـذْكُرُوْا اسْمَ اللهِ عَلى مَـا رَزَقَـهُمْ مِنْ بَـهِيـْمَةِ الْاَنْـعَـامِ
“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানীর এক বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ওসব পশুর উপর আল্লাহর নাম নিতে পারে যে সব আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন”। (সূরা আল হজ্জ-৩৪)
মানব ইতিহাসের সর্ব প্রথম কুরবানী
মানব ইতিহাসের সর্ব প্রথম কুরবানী হযরত আদম আ. এর দু’পুত্র হাবিল ও কাবিলের কুরবানী। এ ঘটনাটি বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী সনদ সহ বর্ণিত হয়েছে। ইবনে কাসীর একে ওলামায়ে মোতাকাদ্দেমীন ও ওলামায়ে মোতায়াখ্খেরীনের সর্ব সম্মত উক্তি বলে আখ্যা দিয়েছেন। ঘটনাটি এই :
যখন আদম ও হাওয়া আ. পৃথিবীতে আগমন করেন এবং সন্তান প্রজনন ও বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যা এরূপ যমজ সন্তান জন্ম গ্রহণ করত। তখন এক শ্রেণীর ভাই বোন ছাড়া হযরত আদমের আর কোন সন্তান ছিলনা। অথচ ভাই বোন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না।
তাই মহান আল্লাহ উপস্থিত প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে আদম আ. এর শরীয়তে বিশেষ ভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্ম গ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন গণ্য হবে। সুতরাং তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্ম গ্রহণকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে কন্যা সহোদরা বোন গণ্য হবে না। তাই তাদের পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ হবে।
কিন্তু ঘটনাক্রমে কাবিলের সহজাত সহোদরা বোনটি ছিল খুবই সুশ্রী-সুন্দরী তার নাম ছিল ‘আকলিমা’ আর হাবিলের সহজাত বোনটি ছিল তুলনামূলক কম সুন্দরী তার নাম ছিল ‘গাজা’। বিবাহের সময়ে হলে নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহজাত অসুন্দরী কন্যা কাবিলের ভাগে পড়ল। এতে কাবিল অসন্তুষ্ট হয়ে হাবিলের শত্রু হয়ে গেল। সে জেদ ধরল যে, আমার সহজাত বোনকেই আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। হযরত আদম আ. তাঁর শরীয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন।
অতঃপর তিনি হাবিল ও কাবিলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা উভয়েই আল্লাহর জন্য নিজ নিজ কুরবানী পেশ কর। যার কুরবানী গৃহীত হবে, সে-ই উক্ত কন্যার পানি গ্রহণ করবে। হযরত আদম আ. এর নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, যে সত্য পথে আছে, তার কুরবানীই গৃহীত হবে।
তৎকালে কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল এই যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নি শিখা এসে কুরবানীকে ভস্মীভূত করে আবার অন্তর্হিত হয়ে যেত। যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
بِـقُـرْبَـانٍ تَـأكُـلُـهُ الـنَّـارُ
“ঐ কুরবানী যাকে আগুন গ্রাস করে নিবে”। (সূরা আলে ইমরান-১৮৩)
আর যে কুরবানীকে অগ্নি ভস্মীভূত করত না, সেটাকে প্রত্যাখ্যাত গণ্য করা হত। কুরবানীর এ তরীকা খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ সা. এর যুগ পর্যন্ত সকল পূর্বেকার নবীর যুগে বলবৎ ছিল।
হাবিল ভেড়া, দুম্মা ইত্যাদি পশু
পালন করত। সে একটি উৎকৃষ্ট দুম্বা কুরবানী করল। কাবিল কৃষি কাজ করত। সে কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কুরবানীর জন্যে পেশ করল। { তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূত্র হযরত ইবনে আব্বাস রা. কর্তৃক বর্ণিত। } অতঃপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নি শিখা অবতরণ করে হাবিলের কুরবানীটি ভস্মীভূত করে দিল এবং কাবিলের কুরবানী যেমন ছিল তেমনি পড়ে রইল। এ অকৃতকার্যতায় কাবিলের দুঃখ ও ক্ষোভ বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না। তাই সে হাবিলকে হত্যা করার সংকল্প করল এবং এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করে ফেলল। (মাআ’রেফুল কুরআন বাংলা সংস্করণ-৩২৪ পৃষ্ঠা।)
হাবিল ও কাবিলের কুরবানীর ঘটনা পবিত্র কুরআনে এ ভাবে বর্ণিত হয়েছে,
وَاتْلُ عَلَيْـهِمْ نَبَاَ ابْـنَـىْ ادَمَ بِـالْـحَـقِّ- اِذْ قَـرَّبَـا قُـرْبَانًا فَـتُـقُـبِّـلَ مِنْ اَحَدِهِمَا وَلَمْ يُـتَـقَبَّلْ مِنَ الْاخَرِ- قَالَ لَاَقْتُلَـنَّكَ- قَالَ اِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِيْنَ- لَئِنْ بَسَطْتَّ اِلَىَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِىْ مَا اَنَا بِبَاسِطٍ يَّدِىَ اِلَيْكَ لِاَ قْتُلَكَ- اِنِّىْ اَخَافُ اللهَ رَبَّ الْعلَمِيْنَ- اِنِّىْ اُرِيْدُ اَنْ تَبُـوْاَ بِـاِثْمِىْ وَاِثْمِكَ فَتَكُـوْنَ مِن اَصْحبِ النَـارِ- وَذلِكَ جَزؤُ الظّلِمِيْنَ- فَطَوَّعَتْ لَـهُ نَـفْسُه قَـتْلَ اَخِـيْـهِ فَقَـتَـلَهُ فَاَصْبَحَ مِنَ الْـخسِرِيْنَ- فَبَـعَـثَ اللهُ غُـرَابًا يَبْحَثُ فِى الْاَرْضِ لِيُرِيَهُ كَـيْـفَ يُـوَارِىْ سَـوْءَةَ اَخِيْهِ- قَالَ يـوَ يْلَتـى اَعَجَزْتُ اَنْ اَكُوْنَ مِـثْلَ هـذَا الْغُرَابِ فَاُوَارِىَ سَـوْءَةً– فَاَصْبَحَ مِنَ النّدِمِيْنَ
“আপনি তাদেরকে আদমের দু’ পুত্রের ঘটনাটি ঠিকভাবে শুনিয়ে দিন। (তা হচ্ছে এই যে,) যখন তারা উভয়ে কুরবানী পেশ করলো, তখন তাদের একজনের কুরবানী গৃহীত হল আর অপর জনের কুরবানী গৃহীত হলোনা। তখন সে ভাইকে বলল- অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করব। সে উত্তরে বলল আল্লাহ তো মুত্তাকীদের কুরবানীই কবুল করেন।
যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর, তবে আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার দিকে হস্ত প্রসারিত করব না। নিশ্চয়ই আমি বিশ্ব জগতের পালন কর্তা আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই যে, আমার পাপ ও তোমার পাপ তুমি নিজের মাথায় চাপিয়ে নাও। অত:পর তুমি দোযখীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাও। এটাই অত্যাচারীদের শাস্তি। অতঃপর তার অন্তর তাকে ভ্রাতৃ হত্যায় উদ্বুদ্ধ করল। অনন্তর সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতি গ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল।
আল্লাহ এক কাক প্রেরণ করলেন। সে মাটি খনন করছিল যাতে তাকে শিক্ষা দেয় যে, আপন ভ্রাতার মৃতদেহ সে কিভাবে সমাহিত করবে। সে বললো, আফসোস! আমি কি এ কাকের সমতুল্যও হতে পারলাম না যে, আপন ভ্রাতার মৃতদেহ সমাহিত করি! অত:পর সে অনুতাপ করতে লাগল”।
(সূরা আল মায়িদাহ, ২৭-৩১ আয়াত।)
উল্লেখ্য যে, হযরত আদম আ. এর পর সকল উম্মতের মধ্যেই অবিচ্ছন্ন ভাবে কুরবানীর ধারাবাহিকতা চলতে থাকে।
আমাদের কুরবানী সুন্নাতে ইবরাহীমী
কুরবানী ইবাদত হিসেবে যদিও আদম আ. এর যুগ হতে হয়ে আসছে কিন্তু পরবর্তীতে হযরত ইবরাহীম আ. এর এক ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে শুরু হয়েছে। আমরা হযরত ইবরাহীম আ. এর মিল্লাতের উপর প্রতিষ্ঠিত আছি। এ মিল্লাতের প্রতিষ্ঠাতা ও মুসলিম জাতির পিতা হচ্ছেন হযরত ইবরাহীম আ.। তিনি যেমন আল্লাহর নির্দেশে জীবনের সবচাইতে প্রিয় বস্তু- পুত্র ইসমাঈলকে তাঁর উদ্দেশ্যে কুরবানী করতে প্রস্তুত ছিলেন, ঈদুল আয্হার দিন মুসলমানরাও তেমনি পশু কুরবানীর মাধ্যমে নিজেদের প্রিয়তম জান-মাল আল্লাহর পথে কুরবানী করার সাক্ষ্য প্রদান করেন।
মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম আ. এর সেই মহত্ব ও মাকবুল কুরবানীকে শাশ্বত রূপদানের জন্যেই আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল সা. এই দিনে মুসলমানদেরকে ঈদুল আয্হা উপহার দিয়েছেন এবং এ কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছেন।
হযরত ইবরাহীম আ. কর্তৃক স্বীয় পুত্র ইসমাঈলের কুরবানীর জীবন্ত ইতিহাস
মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত মহান নবী হযরত ইবরাহীম আ. কে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন ধরনের কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষা করেছেন। তিনি প্রত্যেকটি পরীক্ষায় পূর্ণ সফলকাম প্রমাণিত হয়েছেন। পরীক্ষাগুলি হলো-
এক. তাওহীদের হেফজতের প্রয়োজনে চিরদিনের জন্য প্রিয় জ¤œভূমি ত্যাগ করে হিজরত করলেন। হযরত লূত আ. যিনি ইতিপূর্বে তাঁর উপর ঈমান এনেছিলেন তাকে সাথে নিয়ে নিজ জ¤œভূমি ইরাক থেকে হিজরত করে ফিলিস্তিনের কেনানে অবস্থান নিলেন। ৮৬ বৎসর বয়সে সেখানে বসে আওলাদের জন্য দোয়া করলেন
رَبِّ هَـبْ لِىْ مِـنَ الـصَّالِـحِيْـنَ
“হে আল্লাহ আমাকে সৎ পুত্র দান করুন”।
(সূরা আসসাফ্ফাত-১০০)
মহান আল্লাহ তায়ালা সুসংবাদ দিয়ে বললেন
فَـبَـشَّـرْنهُ بِـغُـلـمٍ حَـلِـيْـمٍ
“ইবরাহীমকে এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। ৯৯ বৎসরের সময় আরেক জন ছেলে হয়েছে তার নাম ইসহাক”।
(সূরা আসসাফ্ফাত-১০১।)
দুই. নমরুদ কর্তৃক প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হয়ে চরম ধৈর্য্যরে ও আল্লাহ প্রেমের পরাকাষ্ঠ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর খলীলের জন্য আগুনকে ফুলবাগীচায় পরিণত করে দিয়েছিলেন।
মহান আল্লাহ্ বলেন
قُلْنَا يا نَارُ كُوْ نِىْ بَرْدًا وَ سَلَا مًا عَلى اِبْرَاهِيْمَ
“আমি বললাম, হে আগুন, তুমি ইবরাহীমের উপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও”। (সূরা আল আম্বিয়া -৬৯।)
তিন. অতঃপর যখন তাঁর প্রিয় আদরের পুত্র ইসমাঈল ও প্রিয় স্ত্রী হযরত হাজেরা আ. কে মক্কার বিরাণ মরুভূমিতে ছেড়ে আসার আদেশ হলো। সেটাও ছিল কঠিন পরীক্ষা। কেননা বার্ধক্য ও শেষ বয়সের বহু আকাংখার স্বপ্নসাধ, দিবা রাত্রির প্রার্থণার ফল এবং পরিবারের একমাত্র আশার আলো হযরত ইসমাঈল কে শুধু আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে পানি ও জনমানবহীন মরু প্রান্তরে রেখে এসেছেন। অথচ একবারও পিছনের দিকে ফিরেও তাকাননি। যেন এমন না হয় যে, পিতৃ¯েœহ উথলিয়ে উঠে এবং আল্লাহর আদেশ পালনে কোন প্রকার বিচ্যুতি ঘটে যায়। স্ত্রী ও পুত্রকে সেখানে রেখে এসে তিনি কেবল আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া করলেন:
رَبَّناَ اِنِّىْ اَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِىْ بِوَادٍ غَيْرِ ذِىْ زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ- رَبَّنَا لِيُقِيْمُوْا الصَّلوةَ فَا جْعَلْ اَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِىْ اِلَيْهِمْ وَاَرْزُقْهُمْ مِّنَ الثَمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُوْنَ
“হে আল্লাহ! আমি নিজের এক বংশধরকে আপনার পবিত্র ঘরের নিকট অনাবাদ জায়গায় বসবাস করালাম। হে আল্লাহ ! যেন তারা নামায কায়েম করে। অত;পর আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদের ফল ফলাদি দ্বারা রুজি দান করুন। আশা করি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে”। (সূরা আল ইবরাহীম -৩৭।)
চার. উপরোল্লিখিত পরক্ষিাগুলির কঠিন মঞ্জিল অতিক্রম করার পর হযরত ইবরাহীম আ. কে স্বপ্নের মাধ্যমে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়। যা বিগত পরীক্ষাগুলির চেয়ে ও অধিক কঠিন, হৃদয় বিদারক ও আল্লাহ প্রেমের কঠিন পরীক্ষা। কোন কোন বর্ণনা মতে জানা যায় যে, এই স্বপ্ন তিনি পরপর তিন রাত্রি দেখেন।
স্বপ্নে তিনি একমাত্র প্রিয় পুত্র ইসমাঈল কে কুরবানী করতে আদিষ্ট হন। প্রাণ প্রিয় পুত্রকে কুরবানী করার নির্দেশ তাঁকে এমন সময় দেয়া হয়েছিল, যখন অনেক দোয়া কামনা করে পাওয়া সন্তানকে লালন পালন করার পর পুত্র পিতার সাথে চলাফেরা করতে পারে এবং তাঁকে সাহায্য করার যোগ্য হয়েছে। তাফসীরবিদগণ লিখেছেন: এ সময় হযরত ইসমাঈলের বয়স ছিল তের বছর। কেউ কেউ বলেছেন তিনি তখন বয়প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন। { তাফরীরে মাযহারী।}
তবে তাফসীরে রুহুল বয়ানে আছে ৯ বছরের কথা। এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত সত্য যে, নবী রাসূলগণের স্বপ্নও ওহীর অর্ন্তভূক্ত। তাই এ স্বপ্নের অর্থ ছিল এই যে, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হযরত ইবরাহীম আ. এর প্রতি একমাত্র পুত্রকে যবেহ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এ হুকুমটি স্বপ্নের মাধ্যমে দেয়ার কারণ হলো হযরত ইবরাহীম আ. এর আনুগত্যের বিষয়টি পূর্ণমাত্রায় প্রমাণিত করা। হযরত ইবরাহীম আ. মহান প্রতি পালকের নির্দেশ সত্বর পালনের নিমিত্তে যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। কিন্তু এ পরীক্ষাটি যেহেতু ইবরাহীম আ. এর ব্যক্তিত্বের সাথে সাথে তার পুত্রও সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাই তিনি তার পুত্র ইসমাঈলকে লক্ষ্য করে বললেন
قَالَ يبُنَىَّ اِنِّىْ اَرى فِى الْمَنَـامِ اَنِّى اَذْ بَـحُـكَ فَـانْـظُـرْ مَـاذَا تَـرى-
“হে প্রাণ প্রিয় পুত্র আমার! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি। সুতরাং তুমি চিন্তা ভাবনা করে দেখ এবং এ স্বপ্নের ব্যাপারে তোমার অভিমত কি? তা বল”। (সূরা আস-সাফফাত-১০২ ।)
যেমন বাপ, তেমন বেটা।
পুত্রও ছিলেন যেন হযরত ইবরাহীম আ. এর ছাঁচে গড়া, কেননা তিনি ও ভাবী নবী। তাই তৎক্ষণাৎ আত্মসর্ম্পনে মস্তক অবনত করে পুত্র জবাবে বললেন :
قَالَ يـاَبَتِ افْـعَـلْ مَا تُـؤْمَرُ- سَـتَـجِـدُ نِىْ اِنْ شَـاءَ اللهُ مِنَ الـصّـبِـرِيْـنَ-
“হে আমার পিতাজী! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন। ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন”। (সূরা আস সাফ্ফাত-১০২।)
পুত্রের সাথে পরামর্শের হিকমত ছিল এই যে,
প্রথমত: পুত্রের দৃঢ়তা, হিম্মত এবং আল্লাহর আনুগত্যের জয্বা সৃষ্টি হওয়ার পরীক্ষা স্বরূপ।
দ্বিতীয়ত : সে আনুগত্য স্বীকার করলে সওয়াব ও প্রতিদানের অধিকারী হবে। কেননা সওয়াবের জন্য নিয়ত ও আগ্রহ জরুরী।
তৃতীয়ত : যবেহের সময় মানুষ হিসেবে এবং স্বভাবজাত পিতৃ¯েœহের কারণে কোন ভূল ভ্রান্তি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে অনেকটা মুক্ত থাকার প্রবল আশা সৃষ্টি হবে।(তাফসীরে রুহুল বয়ান।)
পরামর্শ শেষে পিতা ও পুত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে কুরবানীর নির্দেশ পালনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং এ কাজ সমাধার জন্য তারা মিনা প্রান্তরে গমন করেন।
ইতিহাস ও তাফসীর ভিত্তিক কোন কোন রেওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, শয়তান কুরবানীর মহান একাজে বিভিন্নভাবে বাঁধার সৃষ্টি করে । সে প্রথমে মা হাজেরা ও ইসমাঈল আ. কে উল্টো বুঝিয়ে এ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু তাঁরা শয়তানের প্ররোচনায় কোন পাত্তা দিলেন না। মরদুদ শয়তান হযরত হাজেরা আ. ও হযরত ইসমাঈল আ. কে ধোঁকা দেয়া থেকে নিরাশ হয়ে মিনা যাওয়ার পথে ‘জামরায়ে আকাবাহ’, ‘জামারায়ে উসত্বা’ এবং ‘জামরায়ে উলা’ এই তিন জায়গায় তিনবার হযরত ইবরাহীম আ. কে প্ররোচিত করার চেষ্টা করে এবং হযরত ইবরাহীম আ. প্রত্যেকবারই তাকে সাতটি করে কংকর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাড়িয়ে দেন। অদ্যাবধি এ প্রশংসনীয় কাজের স্মৃতি স্বরূপ মিনায় ঐ তিনটি স্থানে কংকর নিক্ষেপ করার বিধান হাজীদের জন্য ওয়াজিব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
অবশেষে পিতা-পুত্র উভয়ে যখন এই মহান কুরবানীর ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানগাহে পৌঁছলেন এবং ইবরাহীম আ. কুরবানী করার জন্য ইসমাঈল আ. কে শোয়ালেন, তখন পুত্র ইসমাঈল আ. পিতা ইবরাহীম আ. কে বললেন আব্বাজান! আমার হাত পা খুব শক্ত করে বেঁধে নিন যাতে আমি নড়াচড়া করতে না পারি। আর আপনার পরিধেয় বস্ত্রাদি সামলে নিন, যাতে আমার রক্তের ছিটা না পড়ে। অন্যথায় এতে আমার ছওয়াব হ্রাস পেতে পারে। এছাড়া রক্ত দেখলে আমার মা অধিক ব্যাকুল হবেন। আপনার ছুরিটি ধার দিয়ে নিন এবং আমার গলায় দ্রুত চালাবেন, যাতে আমার প্রাণ সহজে বের হয়ে যায়। কারণ, মৃত্যু বড় কঠিন ব্যাপার। আপনি আমার আম্মাজানের নিকট আমার শেষ বিদায়ের সালাম টুকু অনুগ্রহ পূর্বক পৌঁছে দিবেন। যদি আমার জামা তার নিকট নিয়ে যেতে চান, তবে নিয়ে যাবেন।
একমাত্র আদরের সন্তানের মুখে এমন কথা শুনে পিতার মানসিক অবস্থা কি যে হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু হযরত ইবরাহীম আ. দৃঢ়তায় অটল পাহাড় হয়ে জবাব দিলেন, ওগো আমার প্রাণ প্রিয় বৎস! আল্লাহর নির্দেশ পালন করার জন্য তুমি আমার চমৎকার সহায়ক হয়েছ। অতঃপর তিনি পুত্রকে আদর করে চুম্বন করলেন এবং অশ্রু সজল নয়নে তাকে বেঁধে নিলেন ।
অতঃপর তাঁকে সোজা করে শুইয়ে দিয়ে তার গলায় ছুরি চালালেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার যে, বার বার ছুরি চালানো সত্বেও গলা কাটছে না। কেননা আল্লাহ তায়ালা স্বীয় কুদরতে পিতলের একটা টুকরা মাঝখানে অন্তরায় করে দিয়েছিলেন।
তখন পুত্র নিজেই আবদার করে বললেন, আব্বাজী!
আমাকে উপুড় করে শুইয়ে নিন। কারণ, আমার মুখমন্ডল দেখে আপনার মধ্যে
পিতৃ ¯হে উথলে উঠে। ফলে গলা কাটা যাচ্ছে না। এ ছাড়া ছুরি দেখে আমি ঘাবড়ে যাই। সে মতে হযরত ইবরাহীম আ. তাকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন এবং পুনরায় সজোরে প্রাণপণে ছুরি চালালেন।
কিন্তু তখন ও গলা কাটতেছেনা। হযরত ইবরাহীম আ. চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। হযরত ইবরাহীম আ. এর এ প্রাণন্তর প্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হলেন এবং হযরত ইসমাঈলের বিনা যবেহেই তার কুরবানী কবুল করে নিলেন। এ ব্যাপারে হযরত ইবরাহীম আ. এর উপর ওহী নাযিল হলো। (তাফসীরে রুহুল মাআ’নী। সূত্র হযরত কাতাদাহ রা. হতে বর্নিত, তাফসিরে ইবনে কাসীর মসনদে আহমদ থেকে নকল করা হয়েছে। সূত্র হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত।)
فَلَمَّا اَسْلَمَا وَتَلَّه لِلْجَبِيْنِ- وَنَادَيْنهُ اَنْ يَّا اِبْرَاهِيْمَ- قَدْ صَدَّقْتَ الرُّءْيَا- اِنَّا كَذلِكَ نَـجْـزِى الْـمُحْسِنِيْـنَ- اِنَّ هـذَا لَهُـوَ الْـبَلـؤُ الْمُبِيْـنُ- وَقَـدَيْنهُ بِـذِبْحٍ عَـظِـيْمٍ-
“অবশেষে যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আল্লাহর কাছে নিজেদের কে সোপর্দ করলো এরং ইবরাহীম আ. পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন (যবেহ করার জন্যে), তখন আমরা তাকে সম্বোধন করে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি সপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমরা সৎকর্মশীলদের এরূপ প্রতিদানই দিয়ে থাকি। বস্তুত এ এক সুস্পষ্ট কঠিন পরীক্ষা। আর আমরা বিরাট কুরবানী ফিদিয়া স্বরূপ দিয়ে তাকে (ইসমাঈলকে) উদ্ধার করেছি”। (সূরা আস-সাফ্ফাত ১২০-১০৭।)
অতঃপর আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিলেন এখন পুত্রকে ছেড়ে দিন এবং আপনার নিকট যে দুম্বাটি দাঁড়ানো রয়েছে, পুত্রের পরিবর্তে সেটাকে যবেহ করুন। তখন ইবরাহীম আ. পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখেন, একটি হৃষ্ট পুষ্ট দুম্বা দাঁড়ানো আছে। আল্লাহর শোকর আদায় করে তিনি সেই দুম্বাটিকে যবেহ করলেন।
এটাই সেই কুরবানী যা আল্লাহর দরবারে এতই প্রিয় ও মাকবুল হয়েছিল যে, আল্লাহ তায়ালা পরবর্তী সকল উম্মতের মধ্যে তা অবিস্মরণীয় রূপে বিরাজমান রাখার ব্যবস্থা করে দিলেন।
যদ্দরুণ মিল্লাতে ইবরাহীমে তথা দ্বীন ইসলামে এক মহান ওয়াজিব ইবাদত ও শিয়ার প্রতীক হিসেবে এ কুরবানী আজও পালিত হয়ে আসছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা পালিত হতে থাকবে।
তাই মহান আল্লাহ বলেন
وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِى الْا خِرِيْنَ
“আর আমরা ভবিষ্যতের উম্মতের মধ্যে ইবরাহীমের এ সুন্নাত স্মরণীয় করে রাখলাম”। (সূরা আস আস সাফ্ফাত ১০৮।)
বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রতি কুরবানীর নির্দেশ
আল কুরআনে নবী করীম সা. কে সালাত আদায় করার মতো কুরবানী করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে ঃ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“তোমার রবের জন্য নামায পড় এবং কুরবানী করো”। (সূরা আল কাউসার -০২)
মহান আল্লাহ কুরবানী ও জীবন দানের প্রেরণা ও চেতনা সমগ্র জীবনে জাগ্রত রাখার জন্যে নবী সা. কে আরো নির্দেশ দিয়ে বলেছেন
قُلْ اِنَّ صَلوتِىْ وَنُسُكِىْ وَمَحْيَاىَ وَمَمَاتِىْ لِلّهِ رَبِّ الْعلَمِيْنَ– لَا َشَرِيْكَ لَه وَبِذ لِكَ اُمِرْتُ وَاَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ-
“বলুন! হে মুহাম্মদ! আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সব কিছুই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্যে। তাঁর কোন শরীক নেই। আমাকে তাঁরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমি সকলের আগে তাঁর অনুগত ও ফরমাবরদার”। ( সূরা আল আনআম-১৬২)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম সা. মদীনায় দশ বৎসর অবস্থান করেন। এ সময় তিনি প্রতি বছর কুরবানী করতেন।
(সুনানে আত তিরমিযী)
আল্লাহ তায়লা আমাদের প্রচেষ্টাগুলো কবুল করুন। আমিন।
কুরবানীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং শিক্ষানিয় বিষয়

কুরবানীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং শিক্ষানিয় বিষয়

প্রকৃত পক্ষে কুরবানীর তিনটি মৌলিক ও মহান উদ্দেশ্য রয়েছে।
এক. আল্লাহর একত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে সারা দুনিয়ার মুসলমান কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে তাঁরই নামে এবং তাঁরই রাসূল প্রদর্শিত পন্থায় কুরবানী করে। এ সবের মাধ্যমে তারা এ কথারই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই, তিনিই সর্ব শ্রেষ্ঠ সার্বভৌমত্বের মালিক কেবল মাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া অন্য কারো বিধান মানা যেতে পারে না। তাঁর দেয়া শরীয়তই সাফল্যের পথ আর তাঁর সন্তুষ্টি বিধানই মুক্তির চাবিকাঠি।
দুই. মহান আল্লাহ তায়ালার মালিকানা স্বীকার করা। অর্থাৎ সমস্ত জগতের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা। তিনিই অনুগ্রহ করে আমাদের জীবন ও ধন সম্পদ দান করেছেন। আমাদের জীবন ও সম্পদের প্রকৃত মালিক তিনিই। এ জীবন ও সম্পদ তিনি আমাদের নিকট আমানত রেখেছেন। এগুলোর ব্যয় ও পরিচালনার ব্যাপারে আমি সেচ্ছাচারী হতে পারিনা। প্রকৃত মালিকের ইচ্ছা ও সন্তুষ্টি অনুযায়ী এগুলোর ব্যয় ও পরিচালনা হবে। তাঁরই ইচ্ছা ও সন্তুষ্টি অনুযায়ী আমার জীবন সম্পদ ব্যয় করার জন্য আমি সদা প্রস্তুত। এ প্রস্তুতির নিদর্শন স্বরূপই তাঁর নামে পশু কুরবানী করছি। পশু যবেহের সাথে সাথে তার গলদেশ থেকে যেভাবে রক্ত প্রবাহিত হয়, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য তাঁর পথে এমনি করেই আমার বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতেও একনিষ্ঠ ভাবে প্রস্তুত।
তিন. আল্লাহর নেয়ামাতের কৃতজ্ঞতা স্বীকার। অর্থাৎ আমার যাবতীয় ধন-সম্পদ আল্লাহরই দেয়া নেয়ামত। এগলো তাঁরই একান্ত অনুগ্রহ। আমার প্রতি তাঁর এ সীমাহীন অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এ সম্পদ আমি তাঁরই নামে কুরবানী করছি। আমি যে তাঁর নিকট সত্যি কৃতজ্ঞ, আমার এ কুরবানী তারই নিদর্শন।
কুরবানীর রূহানিয়াত ও প্রাণ শক্তি
প্রাক ইসলামী যুগে লোক কুরবানী করার পর তার গোশত বাইতুল্লাহর সামনে এনে রেখে দিত। তার রক্ত বাইতুল্লাহর দেয়ালে দেয়ালে মেখে দিত। কিন্তু আল কুরআন ঘোষণা করলো- তোমাদের এ গোশত ও রক্ত কোনটারই প্রয়োজন আল্লাহর নেই। তাঁর কাছে তো কুরবানীর সে আবেগ-অনুভূতি পৌঁছে যা যবেহ করার সময় তোমাদের মনে সঞ্চারিত হয় বা হওয়া উচিত। গোশত ও রক্তের নাম কুরবানী নয়। বরং কুরবানী এ তত্ত্বেরই নাম যে, আমাদের সব কিছুই আল্লাহর জন্যে এবং তাঁর পথেই উৎসর্গ করতে হবে।
উল্লেখ্য যে, কুরবানকারী শুধু মাত্র পশুর গলায়ই ছুরি চালায় না, বরং তার সকল কু-প্রবৃত্তির উপর ছুরি চালিয়ে তাকে নির্মূল করে। এ অনুভূতি ব্যতীত যে কুরবানী করা হয়, তা হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত ইসমাঈল আ. এর সুন্নাত নয়। এটা একটা জাতীয় রসম মাত্র। তাতে গোশতের ছড়াছড়ি হয় বটে, কিন্তু সেই তাকওয়া পাওয়া যায় না যা কুরবানীর প্রাণ শক্তি।
মহান আল্লাহ বলেন
لَنْ يَنَالَ اللهَ لُحُوْمُهَا وَلَا دِمَائُهَا وَلـكِنْ يَّنَالُهُ التَّقْوى مِنْكُمْ-
“ও সব পশুর রক্ত, মাংস আল্লাহর কাছে কিছুতেই পৌঁছে না। বরং তোমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের তাকওয়া তাঁর কাছে পৌঁছে”। (সূরা আল হজ্জ-৩৭)
যে কুরবানীর পেছনে তাকওয়ার আবেগ-অনুভূতি নেই আল্লাহর দৃষ্টিতে সে কুরবানীর কোনই মূল্য নেই। আল্লাহর কাছে সেই আমলই গ্রহীত হয়, যার প্রেরণা দান করে তাকওয়া ।
এ ব্যাপারে ইরশাদ হচ্ছে -
اِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِيْنَ
“আল্লাহ শুধু মুত্তাকীদের আমল কবুল করেন”। (সূরা আল মায়িদ্হ -২৭)
সুতরাং কারো কারো এ প্রশ্ন করার কোন অবকাশ নেই যে, প্রত্যেক বৎসর জাতি শুধু পশু যবেহ করার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করবে এবং তিনদিন গোশত খাবে। এর দ্বারা তো জাতীয় কোন উন্নতির লক্ষণ দেখা যায় না। কারণ, কুরবানী শুধু গোশত ভক্ষণ করার জন্য নয় বরং ইহা শরীয়তের একটি হুকুম, সুন্নাতে ইবরাহীমী কে স্বরণ করে আল্লাহর রাস্তায় জান মাল কুরবানী করার এক শক্তিশালী জযবা পয়দা হয়। তা নাহলে অন্যান্য উম্মতের জন্যে গোশত খাওয়া তো মোটেও জায়িয ছিলনা।
কুরবানী আল্লাহ তায়ালার একটি বিশেষ রহমত ও বরকতের বিধান
১. কুরবানীর সময় পশু কুরবানী করার মাধ্যমে আমাদের পশু সুলভ আচরণ পরিবর্তিত হয়ে সেটা যথার্থ মানব সুলভ আচরণে পরিণত হয়। সুতরাং কুরবানীর বিধানটা মুমিন বান্দার চরিত্র সংশোধনের জন্য আল্লাহ তায়ালার একটি বিশেষ রহমত।
২. ধনী-গরীব, অসহায়, দুস্থ ইত্যাদি নানা রকম মুসলমান এ দুনিয়ায় বসবাস করে থাকে। আর তারা সকলেই গোশত উপভোগ করার আশা করে থাকে। কিন্তু অভাব, অসুবিধা, অবহেলা, ও স্বভাবগত দোষের কারণে তাদের মধ্যে অনেকে গোশত উপভোগ করার সুযোগ পায়না এবং অনেকে সুযোগ করে নেয় না।
কুরবানী আল্লাহ প্রদত্ত এমন একটি অপরিহার্য বিধান যে, এটি পালন করার ফলে বছরে অন্তত একবার সকলেই আল্লাহ পাকের এ বিশেষ নেয়ামতটি উপভোগ করার সুযোগ পায়। এমনকি কুরবানীর গোশত অমুসলিমদেরকে ও দেয়া যাবে বলে শরীয়তে বলা হয়েছে। সুতরাং কুরবানীর বিধান আল্লাহ প্রদত্ত দুনিয়ার সকল মানুষের জন্যই একটি বিশেষ রহমতের বিধান।
৩. প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পশু কুরবানী করা সত্বেও পরবর্তী এক বছরের মধ্যে আবার কুরবানী দেয়ার মতো পশুতে দুনিয়া ভরে উঠে। আবহমান কাল থেকেই এরকম হয়ে আসছে। এর কারণ হলো কুরবানীর পশু গুলোর প্রতি উপযুক্ত যতœ নেয়া হয়। এ পশু গুলোর উপযুক্ত তদবীর করার ফলে বরকত দেখা যায়। আর যে সব পশুর তদবীর করা হয় না তার বরকত ও দেখা যায় না।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় বিড়াল ও কুকুর একবার কয়েকটি বাচ্চা প্রসব করে অথচ বিড়াল ও কুকুরের সংখ্যা দুনিয়ায় খুব বেশী দেখা যায় না।
অপর পক্ষে গরু একবার একটা বাচ্চা দেয়, তা সত্বেও দুনিয়ায় বিপুল সংখ্যক গরু দেখা যায়। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক গরু কুরবানী দেয়া সত্বেও তা বিলীন হয়ে যায় না। বরকতের জন্যেই এরূপ হয়ে থাকে। আর এটা আল্লাহর একটি বিশেষ রহমত ছাড়া আর কিছুই না।
কুরবানীর শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ
১. প্রকৃত মুসলমান হতে হলে আল্লাহর হুকুম যেরকমই হোক না কেন তা বিনা বাক্যে মেনে নিতে হবে। তার পরিণাম ভাল কি মন্দ তা চিন্তাও করা যাবে না, কারণ, তা আল্লাহর হুকুম। আর আল্লাহর হুকুম মেনে নিলে তার ফল কোন দিন ও মন্দ হয় না।
২. আল্লাহর হুকুম সহজই হোক আর কঠিনই হোক তা মেনে চলার ব্যাপারে মনের ঝোঁক প্রবণতা একই প্রকার থাকতে হবে। কারণ, মানব জীবনের চরম লক্ষ্যই হচ্ছে আল্লাহর যাবতীয় হুকুম আহকাম মেনে চলে সর্বদাই আল্লাহকে রাজী খুশী রাখা। কাজেই মুসলমানদের মনের ঝোঁক সর্বদাই এমন থাকতে হবে যে, আল্লাহর হুকুম মানতে গিয়ে বাঁচলে ও জীবন সফল, মরলেও জীবন সার্থক।
৩. আল্লাহর হুকুম মানার ব্যপারে পার্থিব কোন লাভ-লোকসান, কোন মায়া-মুহাব্বত, কামনা-বাসনা বা যে কোন কিছুর প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারবে না। এটাই প্রকৃত মৃসলমানী।
যেমন হযরত ইবরাহীম আ. রাজী হয়েছেন
১. আগুনের কুন্ডে নিক্ষিপ্ত হতে।
২. সদ্যজাত শিশু সন্তানকে তার মা সহ বিজন মরুভূমির মধ্যে রেখে আসতে।
৩. নিজ হাতে নিজের সন্তানকে কুরবানী করতে, কোন বাঁধাই প্রতিবন্ধক হতে পারেনি।
৪. বছরে মাত্র একবারই আমরা কুরবানী দেই। কিন্তু এর ফল সুদূরপ্রসারী। কুরবানী আমাদের জন্য ত্যাগ ও তিতিক্ষার একটি ট্রেনিং এর ব্যবস্থা ও বটে।
উল্লেখ্য যে, ত্যাগ ও কুরবানী ছাড়া কোন ভাল কাজই সম্পন্ন হতে পারে না। চাই আল্লাহর হক হউক আর বান্দার হকই হউক।
৫. আমাদের দ্বীন দুনিয়ায় উন্নতি ও অগ্রগতি আমাদের সালফে সালেহীনদের কুরবানীর ফসল, যা আমরা ভোগ করতেছি। তাই পরবর্তী প্রজন্মের কল্যাণের জন্যে আমাদেরকে সেই ভাবে কুরবানী ও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।
কুরবানী মুসলিম উম্মাহ্র ঐক্যের প্রতীক
সারা দুনিয়ার মুসলমান ঈদুল আয্হার দিন কুরবানী করার মাধ্যমে এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, তারা এক উম্মাহর অন্তর্ভূক্ত। কেবলমাত্র আল্লাহর নামে পশু কুরবানী করে তারা এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ই তাদের মালিক। তিনি তাদের মা’বুদ, তিনি তাদের রব। তাঁর আইন ছাড়া আর কারো বিধান তারা মানে না।
ইসলামী শরীয়াতের বিধান অনুযায়ী কুরবানী করে তারা এ কথা প্রমাণ করে যে, ইসলামই তাদের জীবনাদর্শ, এটাই তাদের চলার পথ। এটাই হচ্ছে তাদের জীবন বিধান। তারা ইসলাম ছাড়া অন্য কোন পথ ও মত মানতে রাজী নয়। মুহাম্মদ সা. এর সুন্নাতের ভিত্তিতে কুরবানী করে তারা এ কাথারই সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি তাদের একমাত্র রাহবর ও পথ প্রদর্শক, তাঁকে ছাড়া কারো অনুসরণ ও অনুকরণ করতে তারা রাজী নয়। মোট কথা কুরবানী মুসলিম উম্মাহ্র এক শক্তিশালী ঐক্যের প্রতীক।
কুরবানীর দাবী ও আহবান এবং মুসলিম উম্মাহর করণীয়
বছর পরিক্রমায় কুরবানীর ঈদ এসে হাজির হয় মুসলিম জাতিকে হযরত ইবরাহীম আ. এর ত্যাগের চেতনায় নতুন ভাবে উজ্জীবিত করতে।
কুরবানীর সাথে জড়িত রয়েছে হযরত ইবরাহীম আ. এর তাওহীদবাদী জীবন ও একটি জাতি গঠনের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতহাস।
হযরত ইবরাহীম আ. কে আল্লাহ পাক এ শাশ্বত পয়গাম, চিরন্তন ইমামত ও নেতৃত্বের সম্মান দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। এক নতুন জগতের বিনির্মাণের মহান উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে প্রস্তুত করেছিলেন।
তিনি তদানীন্তন সমাজের বিশ্বাস, ধর্মীয় আবেগ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মহাবিদ্রোহ সূচনা করলেন। যার ফলে তাঁকে কঠিন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন:
১. নমরূদ কর্তৃক প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়া।
২. তাওহীদের হেফাজতের প্রয়োজনে চিরদিনের জন্য প্রিয় জন্ম ভূমি ত্যাগ করা।
৩. আল্লাহর নির্দেশে জনশূণ্য মরু-মক্কায় স্ত্রী হাজেরা ও কোলের শিশু ইসমাঈল কে রেখে যাওয়া ইত্যাদি ছিল বিশ্ব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম জাতি গঠনের যোগ্যতা অর্জনের বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা।
৪. হযরত ইবরাহীম আ. এর জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা, প্রেমের অগ্নি পরীক্ষা এলো চুড়ান্ত পর্যায়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ দেখতে চাইলেন তাঁর খলীলের ভালবাসা তাঁর প্রতি কতটা একনিষ্ঠ ও নির্ভেজাল। তাই নির্দেশ এলো কলিজার টুকরা ইসমাঈলকে কুরবানী করে দাও। নির্দেশ পাওয়া মাত্র তিনি প্রস্তুত হলেন আল্লাহর ইচ্ছা পূর্ণ করার জন্য। পুত্র ইসমাঈলকে তিনি জানিয়ে দিলেন আল্লাহর ইচ্ছার কথা। বালক ইসমাঈল আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজেকে কুরবানীর জন্য পেশ করে দিলেন। আল্লাহর নামে কুরবানী হওয়া, আল্লাহর নির্দেশে প্রিয় সন্তানের কুরবানী দেয়া, উভয়ই ছিল আল্লাহর প্রেমের উজ্জল ¯িœগ্ধতায় শুভ্র সমুজ্জল। শয়তানের প্ররোচনায় পার্থীব মায়া-মমতা উপেক্ষা করে প্রত্যয় দীপ্ত পদক্ষেপে তাঁরা এগিয়ে গেলেন তাদের লক্ষ্যে। মিনা প্রান্তরে তপ্ত বালুতে পরম যতেœ প্রিয় পুত্রকে শুইয়ে দিলেন পিতা ইবরাহীম আ.। পূর্ণ শক্তিতে তীক্ষè শানিত ছুরি চালালেন পুত্রের গলায়। আল্লাহর মহাপরীক্ষা সফল হলো, ইবরাহীম আ. উত্তীর্ণ হলেন।
আল্লাহর প্রেমের এমন ঘটনাকে চির অমর করার উদ্দেশ্যে,
এমন কুরবানীর প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য আল্লাহ প্রতি বছর ঈদুল আয্হার দিনগুলোতে সকল মুসলমানদের জন্য এই কুরবানীর বিধান কে এক উত্তম ইবাদত হিসেবে ওয়াজিব করে দিলেন।
ঈদুল আয্হার উৎসব ভুরিভোজনের কোন উৎসব নয়! বরং খোদাদ্রোহী তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রথম পাঠ-প্রথম সবক। এ পাঠকে মুসলমান জাতির জন্য ওয়াজিব তো এজন্যই করে দেয়া হয়েছে, যেন তারা এই ঈদ উৎসবের মাধ্যমে আল্লাহর রাহে প্রাণ দেয়ার উৎসাহ পায়, সাহস অর্জন করে। হযরত ইবরাহীম ও হযরত ইসমাঈলের এ অভূতপূর্ব দৃশ্য বারবার ভেসে উঠে পবিত্র ঈদে মুসলমানদের মানস পটে।
কুরবানীর আগমন ঘটে মুসলমান জাতির অন্তরে এ জীবন অনুভূতি জাগ্রত করার জন্য যে, ঈমান ও তাওহীদের পথে তাদের এ জীবন হচ্ছে দুনিয়ার সকল অপশক্তি ও শয়তানী চক্রের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম ও সংঘাতের জীবন।
এই কুরবানী আহবান জানায় মুসলমান জাতিকে শক্তিশালী ঈমান, নির্ভেজাল প্রেম এবং নজীরবিহীন ত্যাগ ও কুরবানীর আদর্শ অনুসরনের মাধ্যমে অন্যায় , অসত্য ও খোদাদ্রোহী তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণায়।
আল্লাহর কাছে কুরবানীর পশুর রক্ত মাংস কিছুই পৌঁছেনা। বরং আল্লাহর কাছে পৌঁছে বান্দার তাকওয়া, আন্তরিকতা ও একাগ্রতা। যেহেতু আজ আমাদের অন্তরে আল্লাহর প্রতি মহব্বত অনুপস্থিত, নিয়তের প্রবিত্রতা কলুষিত তাই কুরবানীর রক্ত শুধু জমিনই লাল করছে, আমাদের হৃদয়কে আল্লাহর মহব্বতে রঞ্জিত করছেনা। সে জন্য আমাদের কুরবানী আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে, যা আমাদেরকে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার হিম্মত জোগাচ্ছেনা।
জাতির সত্যিকার কল্যাণ করতে হলে ত্যাগ করতে হবে হযরত ইবরাহীমের আ. মতো। আজ আমরা ইবরাহীমী কুরবানীকে ভূলে গেছি। আজ তাই গোটা বিশ্বে মুসলমানদের করুণ দশা। আমাদের কুরবানীর অবস্থা দেখে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বলেছিলেন,
“ঈদের নামায আমাদের শিখিয়েছে সত্যিকার কুরবানী করলেই মিলবে নিত্যানন্দ।
আমরা গরু-ছাগল কুরবানী করে খোদাকে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করছি। তাতে করে আমরা নিজেদেরকেই ফাঁকি দিচ্ছি। আমাদের মনের ভিতরে যে সব পাপ, অন্যায় স্বার্থপরতা ও কুসংস্কারের গরু-ছাগল যা আমাদের সৎবৃত্তির ঘাস খেয়ে আমাদের মনকে মরুভূমি করে ফেলেছে, আসলে কুরবানী করতে হবে সেই সব গরু-ছাগলের।
হযরত ইবরাহীম আ. নিজের প্রাণতুল্য পুত্রকে কুরবানী করে দিলেন বলেই তিনি নিত্যানন্দের অধিকারী হয়েছিলেন। আমরা তা করিনি বলেই আমরা কুরবানী শেষ করে চিড়িয়াখানায় যাই তামাসা দেখতে। আমি বলি ঈদ করে যারা চিড়িয়াখানায় যায়, তারা চিড়িয়াখানায় থেকে যায় না কেন?”
মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ জনতাকে নজরুলের ভাষায় চিড়িয়াখানায় আশ্রয় নেবার সময় এসেছে। কারণ, আজো আমরা কুরবানীর পশুর গলায় ছুির চালাতে গিয়ে মুখে উচ্চারণ করি -
اِنَّ صَلوتِىْ وَ نُسُكِىْ وَمَحْيَاىَ وَمَمَاتِىْ للهِ رَبِّ الْعلَمِيْنَ
“আমার সব প্রার্থণা নামায, রোযা, তাপস্য, জীবন-মরণ সব কিছু বিশ্বের একমাত্র পরম প্রভূ আল্লাহর পবিত্র নামে নিবেদিত”।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো অন্তরে এর কোন অনুভূতিই নেই। যখন মুসলমানদের কুরবানীতে হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত ইসমাঈল আ. এর ত্যাগের অনুভূতি বিদ্যমান ছিল তখন দেখেছি ওহুদের যুদ্ধে, বদরের ময়দানে, খায়বরের জঙ্গে মুসলমানদের বিজয়। দেখেছি হযরত ওমর ফারুক রা. এর বিশ্ব বিজয়ী বাহিনীকে অগ্রসৈনিক রূপে, দেখেছি দূর আফ্রিকায় মুসা, তারিকের, মিশরের পিরামিডের পার্শ্বে, ইরান মুলুকের আলবোর্জের জিব্রাল্টারের উত্তুঙ্গ জলরাশির মধ্যে নাঙ্গা শমশের হাতে মুসলিম সেনাদেরকে ঝাঁপিয়ে পড়তে। দেখেছি ক্রুসেডের রণে, জেহাদের জঙ্গে সুলতান সালাউদ্দীনের বিজয়।
আজ আল্লাহর রাহে কুরবানীর চেতনায় ইবরাহীমী জযবা নেই বিধায় গোটা বিশ্বব্যাপী মুসলমান চরম ভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আজ মা হাজেরার অনুপ্রেরণায় শত শত মা তাদের কচি-কচি সন্তানকে শুধু মাত্র ঈমানী জযবায় শহীদী ঈদগাহে পাঠাচ্ছেন। শত শত নারী-পুরুষ জীবন বিলাচ্ছে তাদের ঈমান, ইজ্জত রক্ষা করতে। আর বিচ্ছিন্ন ভাবে নয়, শক্তিমান দানবদের উৎপাত থামাতে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে এক হয়ে জান-মালের কুরবানীর জন্য এগিয়ে আসতে হবে। শুধু মাত্র গরু কুরবানী করেই আল্লাহ কে ফাঁকি দিলে গোটা জাতি ফাঁকির অতল গর্ভে হারিয়ে যাবে।
মুসলামান জাতিকে স্মরণ করা প্রয়োজন রাসূল সা. ও সাহাবাদের কুরবানীর ইতিহাস। তাঁদের কুরবানীর অন্যতম ইতিহাস হোদায়বিয়ার প্রান্তরের কুরবানী। হোদায়বিয়ার প্রান্তরে একদিকে রাসূল সা. এর সাথে নিয়ে আসা কুরবানীর পশুগুলোকে কুরবানী দিলেন, অন্য দিকে শত্রুদেশে এসে একদল মুসলামানের সত্যের জন্য আতœদানের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। এই দ্বিবিধ কুরবানীর ফলে মুসলমানদের জন্য আল্লাহ কবুল করলেন “ফতহে মুবীন” সুস্পষ্ট বিজয়।
কুরবানীর শিক্ষাকে সার্থক করার জন্য আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন গোটা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ কে সম্মিলিত হওয়া, সংঘবদ্ধ হওয়া। যে উখ্ওয়াত-সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, যে একতা ছিল মুসলিমের আদর্শ যার জোরে মুসলিম জাতি এক শতাব্দীর মধ্যে পৃথিবী জয় করেছিল, আজ আমাদের সে একতা নেই তারা হিংসায়, ঈর্ষায়, কলহে ঐক্যহীন বিচ্ছিন্ন, এই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ গ্রহণ করেছে ইসলামের শত্রুরা।
মুসলমানদের বিজয়ের পেছনে ছিল ঐক্যবদ্ধতা, মৃত্যু ভয়হীনতা ও আল্লাহর রাহে জানমালের কুরবানী। এসব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে মুসলমানেরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
রাসূলুল্লাহ সা. মুসলমানদেরকে সাবধান করে বলেছেন : শিঘ্রই আমার উম্মতের উপর এমন একটি দু:সময় আসবে যখন দুনিয়ায় বিভিন্ন জাতি তাদের দিকে এমন ভাবে ধাবিত হবে যেমন ধাবিত হয় ক্ষুধার্ত মানুষ খাদ্যের দিকে। সাহাবাদের কেউ একজন জিজ্ঞেস করলেন, তখন আমরা সংখ্যায় এতোই কম থাকবো? (যে অন্যান্য জাতিগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদেরকে গিলে ফেলার জন্য ছুটে আসবে?) রাসূলুল্লাহ সা. বললেন: না, সেদিন তোমাদের সংখ্যা কম হবেনা বরং তোমরা সংখ্যায় অধিক হবে। কিন্তু তোমরা হবে বন্যার পানির ফেনার সমতুল্য। অবশ্যই আল্লাহ সে সময় তোমাদের শত্রুর অন্তর থেকে তোমাদের ভীতি দূর করে দেবেন এবং তোমাদের মনে তাদের ভয় সৃষ্টি করে দেবেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন : হুজুর! আমাদের মনে এ দূর্বলতা ও ভীতি দেখা দেয়ার কারণ কি হবে?
রাসূলুল্লাহ সা. বললেন -
حُبُّ الدُّنْيَا وَكَرَا هِيَةُ الْمَوْتُ দুনিয়া প্রীতি ও মৃত্যুভীতি। অর্থাৎ সেদিন তোমরা দুনিয়াকে ভালোবাসবে, দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরবে এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ পরিত্যাগ করবে। { সুনানে আবু দাউদ, সূত্র: হযরত সাওবান রা. হতে বর্ণিত।}
রাসূলুল্লাহ সা. এর হাদীস আজ সত্যে পরিণত হয়েছে।
আজ গোটা মুসলিম বিশ্বকে জয় করে নিচ্ছে ইহুদী,নাসারা ও মুশরিক ঐক্যবদ্ধ শক্তি। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে মুসলমানদের ঈদগাহে আসতে হবে শুধু কুরবানীর পশু নিয়ে নয়, বরং রাসূলের আদর্শে আদর্শিত হয়ে নিজেদের জান-মাল কে আল্লাহর রাহে কুরবানীর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে।
বর্তমান বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কাছে কুরবানী আহবান জানায় শক্তিশালী ঈমান, নির্ভেজাল প্রেম এবং নজীর বিহীন ত্যাগ ও কুরবানীর ইবরাহীমী আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে বদ্ধমুল কুসংস্কার, অসত্য কুফরীও তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করার। কুরবানীর এ আহবানে সাড়া দিতে পারলেই এক নতুন সাজে সজ্জিত এবং নতুন প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠবে তাওহীদবাদী গোট মুসলিম উম্মাহ্। বিজয় মুসলমানদেরই হবে ইন্শাআল্লাহ।
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন -
وَ لَا تَهِنُوْا وَلَا تَحْزَنُوْا وَ اَنْتُمُ الْاَعْلَوْنَ اِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِيْنَ-
“আর তোমরা নিরাশ হয়োনা এবং দুঃখ করোনা। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই বিজয়ী হবে। { সূরা আলে ইমরান -১৩৯।}
মহান আল্লাহ আরো বলেন -
وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِيْنَ
“মুমিনদের সাহায্য করা আল্লাহর জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে যায়”।{ সূরা আর রূম -৪৭।}
মহান আল্লাহ আরো ঘোষণা করেন -
اَلَا اِنَّ نَصْرَ اللهِ قَرِيْبٌ-
“ সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটেই”। { সূরা আল বাকারাহ -২১৪।}
জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বলেছিলেন -
“ভেঙ্গেছে দুয়ার, জেগেছে জোয়ার, রেঙেছে পূর্বাচল,
খুলে গেছে দেখ দুর্গতি ভরা দুর্গের অর্গল।
মৃত্যুর মাঝে অমৃত যিনি এনেছে তার বাণী,
পেয়েছি তাহার পরমাশ্রয়, আর ভয় নাহি মানি।
সকল ভয়ের মাঝে রাজে যার পরম অভয় কোল,
সেই কোলে যেতে আয়রে কে দিবি মরণ দোলাতে দোল।”
আসুন! আমরা মুসলিম উম্মাহ্ ঈদুল আয্হায় কুরবানীর পবিত্র উৎসবে সেই মরণ দোলাতে দোল দিয়ে বিশ্বকে বাঁচাই ।