Tuesday, March 21, 2017

বেজোড় ইকামত সম্পর্কে আনাস রা. বর্ণিত হাদীসটির ব্যাখ্যা:

 বাক্যগুলো একবার করে পড়ার ব্যাপারে একটি মাত্র সহীহ হাদীস আছে বুখারী, মুসলিম সহ অনেক হাদীসের কিতাবে। হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হযরত আনাস রা.। তিনি বলেছেন:

امر بلال ان يشفع الاذان ويوتر الاقامة

অর্থাৎ বিলালকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে আযানের বাক্যগুলো জোড় বলতে, আর ইকামতের বাক্যগুলো বেজোড় বলতে।

হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ থেকে বোঝা যায়: ইকামতের বাক্যগুলো একবার করে বলতে হবে।

👉আলেমগণ পূর্বের হাদীসগুলির কারণে এ হাদীসটির দুটি ব্যাখ্যা করেছেন:

👉এক. যারা এ হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ অনুসারে আমল করেন তারা সকলে শুরু ও শেষে আল্লাহু আকবার দুবার করেই বলেন। এতো জোড় সংখ্যা। ইমাম নববী র. মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে এই সমস্যার সমাধানে বলেছেন, যেহেতু আল্লাহু আকবার দুবার বললেও এক নিঃশ্বাসে বলা হয় তাই এটাকে একবারের অর্থেই ধরা হবে। জোড় ধরা হবে না।

হানাফী আলেমগণ বলেন, বোঝা গেল অন্যান্য বাক্যগুলোও যদি এক নিঃশ্বাসে পড়া হয় তবে দুবার করে পড়লেও একবারই ধরা হবে, জোড় ধরা হবে না।

তাই তাঁরা বলেছেন, সুন্নাত হলো প্রথম চার বার আল্লাহু আকবার এক নিঃশ্বাসে পড়বে। যাতে বিলাল রা. এর এ হাদীস অনুসারেও আমল হয়ে যায়।

👉দুই. এ হাদীসে যে একবার করে বলতে বলা হয়েছে, এটি পূর্বে ছিল। পরবর্তীকালে এ আদেশটি রহিত হয়ে গেছে। যার প্রমাণ পূর্ববর্তী হাদীসগুলো। ইমাম তাহাবী র. বলেছেন:
ثم ثبت هو من بعد على التثنية في الإقامة بتواتر الآثار في ذلك فعلم أن ذلك هو ما أمر به.

অর্থাৎ পরবর্তীতে বিলাল রা. ইকামতের বাক্যগুলো দুবার করেই বলতেন; যা বহু সংখ্যক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। বোঝা গেল তিনি পরে এই নিয়ম অনুসরণের জন্যই আদিষ্ট হয়েছিলেন।

খোদ আল্লামা শাওকানী(র.) যিনি নিজেও লা-মায্হাবী ছিলেন:
আবূ মাহযূরা রা. এর হাদীসের ভিত্তিতে বিলাল রা. এর একবার বলার আমলকে মানসূখ বা রহিত বলে মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ নায়লুল আওতারে তিনি লিখেছেন-
وهو متأخر عن حديث بلال الذي فيه الأمر بإيتار الإقامة لأنه بعد فتح مكة لأن أبا محذورة من مسلمة الفتح وبلال أمر بإفراد الإقامة أول ما شرع الأذان فيكون ناسخا . وقد روى أبو الشيخ ( أن بلالا أذن بمنى ورسول الله صلى الله عليه وآله وسلم ثَمَّ مرتين مرتين وأقام مثل ذلك ) إذا عرفت هذا تبين لك أن أحاديث تثنية الإقامة صالحة للاحتجاج بها لما أسلفناه وأحاديث إفراد الإقامة وإن كانت أصح منها لكثرة طرقها وكونها في الصحيحين لكن أحاديث التثنية مشتملة على الزيادة فالمصير إليها لازم لا سيما مع تأخر تاريخ بعضها كما عرفناك .

অর্থাৎ একবার বলার আদেশ সম্বলিত বিলাল রা. এর হাদীসটির পরে হলো আবূ মাহযূরা রা. এর এ হাদীস। কারণ এটি মক্কা বিজয়ের পরের ঘটনা। আবূ মাহযূরা রা. তো মক্কা বিজয় কালে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবুশ্ শায়খ র. বর্ণনা করেছন যে, বিলাল রা. মিনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থিতিতে আযান ও ইকামতের বাক্যগুলো দুবার করে বলেছেন।

এ আলোচনা থেকে নিশ্চয়ই পাঠকের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ইকামতের বাক্যগুলো দুবার করে বলার হাদীসগুলো প্রমাণ স্বরূপ পেশ করার উপযুক্ত। আর একবার করে বলার হাদীসগুলো যদিও অধিক সনদে ও বুখারী মুসলিমে বর্ণিত হওয়ার কারণে অধিক সহীহ, কিন্তু দুবার বলার হাদীসগুলোতে বাড়তি বিষয় রয়েছে, আর এগুলো পরবর্তী কালের বিধান সম্বলিত।এসব কারণে এগুলো অনুসারে আমল করাই উচিত। (টীকা-১)
(নায়লুল আওতার ২/২২)

পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই। ইকামতের বাক্যগুলো একবার করে বলা হবে না দুবার করে, এ নিয়ে ফকীহ ইমামগণের মধ্যেও দ্বিমত ছিল। কিন্তু ঝগড়া ছিল না। বরং ইমাম ইবনু আব্দিল বার র. উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আহমাদ, ইসহাক, দাউদ যাহেরী ও ইবনে জারীর তাবারী র. প্রমুখ এ এখতেলাফকে মুবাহ এখতেলাফ আখ্যা দিয়েছেন, এবং বলেছেন যেভাবেই করুক জায়েয হবে।

👉এমনকি লা-মাযহাবী আলেম তিরমিযী শরীফের ভাষ্যকার মুবারকপুরী সাহেবও লিখেছেন,
ما ذهب إليه الإمام أحمد وإسحاق بن راهويه وغيرهما من جواز إفراد الإقامة وتثنيتها هو القول الراجح المعمول عليه بل هو المتعين عندي.

একবার করে বলা বা দুবার করে বলা উভয়টিই জায়েয বলে আহমাদ ও ইসহাক ইবনে রাহূয়াহ যে মত অবলম্বন করেছেন সেটিই অগ্রগণ্য ও নির্ভরযোগ্য মত।
এমনকি আমার দৃষ্টিতে সেটিই সুনিশ্চিত।

=========================================

★★★★★★প্রয়োজনীয় টিকাসমুহঃ★★★★★★

✒(টীকা-১)
ইন্টারনেটে কোন কোন বন্ধু সম্ভবত তিনি মুযাফফর বিন মুহসিনই হবেন আমাদের এ মাসআলাটির উত্তর দিতে গিয়ে শাওকানী সাহেবের এ বক্তব্য সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, ‘প্রকৃতপক্ষে উক্ত উপস্থাপনাটি ইমাম শওকানীর (রহ) নিজস্ব কথা নয়। বরং আলেমদের মধ্যকার বিতর্কগুলো তুলে ধরার ধারাবাহিকতায় উক্ত আলোচনাটি এসেছে।’ এটা মন্তব্যকারীর স্পষ্ট জালিয়াতি। আমরা পুনরায় শওকানীর নায়লুল আওতার বের করে দেখেছি। তিনি শুধু এতটুকু বলেই ক্ষ্যান্ত হননি, বরং এ বক্তব্যের উপর উত্থাপিত সকল প্রশ্ন ও অভিযোগের জবাবও প্রদান করেছেন হাদীসের আলোকে। মুযাফফর বিন মুহসিন আরবী ভাল বোঝেন না, সে কথা আমরা পরবর্তী অনেক মাসআলার পরিশিষ্টে তুলে ধরেছি। এখানে তিনি না বুঝেও এমন কথা লিখতে পারেন।

والله أعلم باالصواب.

📒সুত্রঃ দলিল সহ নামাযের মাসায়েল।

✍🏻লিখকঃমাওলানা আব্দুল মতিন (দাঃ.বাঃ)


শেয়ার করুন

0 Comments:

একটা ভাল মন্তব্য আমাদের আরও ভাল কিছু লিখার অনুপেরনা যাগাই!