Showing posts with label বিষয় ভিত্তিক মাসয়ালা. Show all posts
Showing posts with label বিষয় ভিত্তিক মাসয়ালা. Show all posts

Sunday, May 5, 2019

রোযা পালনকারীর জন্য ৩১টি মাসআলা ৷  মুফতি তকি ওসমানি হা.ফি.

রোযা পালনকারীর জন্য ৩১টি মাসআলা ৷ মুফতি তকি ওসমানি হা.ফি.


১. ইনজেকশন (Injection): ইনজেকশন নিলে রোযা ভাঙ্গবে না। (জাওয়াহিরুল ফতওয়া)

২. ইনহেলার (Inhaler): শ্বাসকষ্ট দূর করার লক্ষ্যে তরল জাতীয় একটি ঔষধ স্প্রে করে মুখের ভিতর দিয়ে গলায় প্রবেশ করান হয়, এভাবে মুখের ভিতর ইনহেলার স্প্রে করার দ্বারা রোজা ভেঙ্গে যাবে। (ইমদাদুল ফতওয়া)

৩ .এনজিও_গ্রাম (Angio Gram): হার্ট ব্লক হয়ে গেলে উরুর গোড়া দিয়ে কেটে বিশেষ রগের ভিতর দিয়ে হার্ট পর্যন্ত যে ক্যাথেটার ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হয় তার নাম এনজিও গ্রাম। এযন্ত্রটিতে যদি কোন ধরনের ঔষধ লাগানো থাকে তারপরেও রোজা ভাঙ্গবে না। (ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা)

৪. এন্ডোস_কপি (Endos Copy): চিকন একটি পাইপ যার মাথায় বাল্ব জাতীয় একটি বস্তু থাকে। পাইপটি পাকস্থলিতে ঢুকানো হয় এবং বাইরে থাকা মনিটরের মাধ্যমে রোগীর পেটের অবস্থা নির্নয় করা হয়। এ নলে যদি কোন ঔষধ ব্যবহার করা হয় বা পাইপের ভিতর দিয়ে পানি/ঔষধ ছিটানো হয়ে থাকে তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে, আর যদি কোন ঔষধ লাগানো না থাকে তাহলে রোযা ভাঙ্গবে না। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)

৫. নাইট্রোগ্লিসারিন (Nitro Glycerin): এরোসল জাতীয় ঔষধ, যা হার্টের জন্য দুই-তিন ফোটা জিহ্বার নীচে দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখে।ঔষধটি শিরার মাধ্যমে রক্তের সাথে মিশে যায় এবং ঔষধের কিছু অংশ গলায় প্রবেশ করার প্রবল সম্ভবনা রয়েছে। অতএব- এতে রোজা ভেঙ্গে যাবে। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)

৬. লেপারোস_কপি (Laparoscopy): শিক্ জাতীয় একটি যন্ত্র দ্বারা পেট ছিদ্র করে পেটের ভিতরের কোন অংশ বা গোশত ইত্যাদি পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে বের করে নিয়ে আসার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র। এতে যদি ঔষধ লাগানো থাকে তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে অন্যস্থায় রোযা ভাঙ্গেব না। (আল মাকালাতুল ফিকহীয়া)

৭. অক্সিজেন (Oxygen): রোজা অবস্থায় ঔষধ ব্যবহৃত অক্সিজেন ব্যবহার করলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। তবে শুধু বাতাসের অক্সিজেন নিলে রোযা ভাঙ্গবে না। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)

৮. মস্তিস্ক_অপারেশন (Brain Operation): রোজা অবস্থায় মস্তিস্ক অপারেশন করে ঔষধ ব্যবহার করা হোক বা না হোক রোজা ভাঙ্গবে না। (আল মাকালাতুল ফিকহীয়া)

৯. রক্ত নেয়া বা দেয়া : রোজা অবস্থায় শরীর থেকে রক্ত বের করলে বা শরীরে প্রবেশ করালে রোজা ভাঙ্গবে না। (আহসানুল ফতওয়া)

১০. সিস্টোসকপি (cystoscopy): প্রসাবের রাস্তা দিয়ে ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে যে পরীক্ষা করা হয় এর দ্বারা রোজা ভাঙ্গবে না। (হেদায়া)

১১. প্রক্টোসকপি (proctoscopy): পাইলস, পিসার, অর্শ, হারিশ, বুটি ও ফিস্টুলা ইত্যাদি রোগের পরীক্ষাকে প্রক্টোসকপ বলে।মলদ্বার দিয়ে নল প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষাটি করা হয়। রোগী যাতে ব্যথা না পায় সে জন্য নলের মধ্যে গ্লিসারিন জাতীয় কোন পিচ্ছল বস্তু ব্যবহার করা হয়। নলটি পুরোপুরী ভিতরে প্রবেশ করে না। চিকিৎসকদের মতানুসারে ঐ পিচ্ছিল বস্তুটি নলের সাথে মিশে থাকে এবং নলের সাথেই বেরিয়ে আসে, ভেতরে থাকে না। আর থাকলেও তা পরবর্তীতে বেরিয়ে আসে। যদিও শরীর তা চোষে না কিন্তু ঐ বস্তুটি ভিজা হওয়ার কারণে রোজা ভেঙ্গে যাবে।(ফতওয়া শামী)

১২. কপার-টি (Coper-T): কপার-টি বলা হয় যোনিদ্বারে প্লাস্টিক লাগানোকে, যেন সহবাসের সময় বীর্যপাত হলে বীর্য জরায়ুতে পৌছাতে না পারে। এ কপার-টি লাগিয়েও সহবাস করলে রোযা ভেঙ্গে যাবে।কাযা কাফফারা উভয়টাই ওয়াজিব হবে।

১৩. সিরোদকার অপারেশন(Shirodkar Operation):সিরোদকার অপারেশন হল অকাল গর্ভপাত হওয়ার আশংখা থাকলে জরায়ুর মুখের চতুষ্পার্শ্বে সেলাই করে মুখকে খিচিয়ে রাখা।এতে অকাল গর্ভপাত রোধ হয়।যেহেতু এতে কোন ঔষধ বা বস্তু রোযা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য খালি স্থানে পৌছে না তাই এর দ্বারা রোযা ভাঙ্গবে না।

১৪. ডি_এন্ড_সি (Dilatation and Curettage): ডি এন্ড সি হল আট থেকে দশ সপ্তাহের মধ্য Dilator এর মাধ্যমে জীবত কিংবা মৃত বাচ্চাকে মায়ের গর্ভ থেকে বের করে নিয়ে আসা। এতে রোযা ভেঙ্গে যাবে। অযথা এমন করলে কাযা কাফফারা উভয়টি দিতে হবে এবং তওবা করতে হবে।(হেদায়া)

১৫. এম_আর(M.R): এম আর হল গর্ভ ধারণের পাঁচ থেকে আঁট সপ্তাহের মধ্যে যোনিদ্বার দিয়ে জরায়ুতে এম,আর সিরন্জ প্রবেশ করিয়ে জীবত কিংবা মৃত ভ্রণ নিয়ে আসা। যারপর ঋতুস্রাব পুনরায় হয়। অতএব মাসিক শুরু হওয়ার কারণে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং কাযা করতে হবে। কিন্তু যদি রাতের বেলা করা হয় তাহলে দিনের রোজা কাযা করতে হবে না। (ফতহুল কাদীর)

১৬. আলট্রাসনোগ্রাম(Ultrasongram): আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষায় যে ঔষধ বা যন্ত্র ব্যবহার করা হয় সবই চামড়ার উপরে থাকে, তাই আলট্রাসনোগ্রাম করলে রোযা ভাঙ্গবে না। (হেদায়া)

১৭. স্যালাইন (Saline): স্যালাইন নেয়া হয় রগে, আর রগ যেহেতু রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তা নয়, তাই স্যালাইন নিলে রোজা ভাঙ্গবে না, তবে রোজার কষ্ট লাঘবের জন্য স্যালাইন নেয়া মাকরূহ। (ফতওয়ায়ে দারাল উলূম)

১৮. টিকা নেয়া (Vaccine) : টিকা নিলে রোজা ভাঙ্গবে না। কারণ, টিকা রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তায় ব্যবহার করা হয় না। (আপকে মাসায়াল)

১৯. ঢুস লাগানো (Douche): ঢুস মলদ্বারের মাধ্যমে দেহের ভিতরে প্রবেশ করে, তাই ঢুস নিলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। ঢুস যে জায়গা বা রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করে এ জায়গা বা রাস্তা রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য স্থান । (ফতওয়া শামী)

২০. ইনসুলিন গ্রহণ করা: (Insulin): ইনসুলিন নিলে রোজা ভাঙ্গবে না। কারণ, ইনসুলিন রোযা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করে না এবং গ্রহণযোগ্য খালী জায়গায় প্রবেশ করে না।(জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)

২১. দাঁত তোলা: রোজা অবস্থায় একান্ত প্রয়োজন হলে দাঁত তোলা জায়েয আছে। তবে অতি প্রয়োজন না হলে এমনটা করা মাকরূহ। ঔষধ যদি গলায় চলে যায় অথবা থুথু থেকে বেশী অথবা সমপরিমান রক্ত যদি গলায় যায় তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। (আহসানুল ফতওয়া)

২২. পেস্ট, টুথ পাউডার ব্যবহার করা : রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় টুথ পাউডার, পেস্ট, মাজন ইত্যাদি ব্যবহার করা মাকরূহ। কিন্তু গলায় পৌঁছালে রোজা ভেঙ্গে যাবে। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)

২৩. মিসওয়াক করা : শুকনা বা কাঁচা মিসওয়াক দিয়ে দাঁত মাজার দ্বারা রোজার কোন ক্ষতি হয় না। চাই যখনই করা হোক না কেন। (ফতওয়া শামী)

২৪. মুখে_ঔষধ ব্যবহার করা : মুখে ঔষধ ব্যবহার করে তা গিলে ফেললে বা ঔষধ অংশ বিশেষ গলায় প্রবেশ করলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। গলায় প্রবেশ না করলে রোজা ভাঙ্গবে না। (ফতওয়া শামী)

২৫. রক্ত_পরীক্ষার জন্য রক্ত দিলে রোযার কোন ক্ষতি হবে না। তবে খুব বেশী পরিমাণে রক্ত দেয়া যার দ্বারা শরীরে দুর্বলতা আসে, তা মাকরূহ।

২৬. ডায়াবেটিসের ‍সুগার মাপার জন্য সুচ ঢুকিয়ে যে একফোটা রক্ত নেয়া হয়, এতে রোযার কোন ক্ষতি হবে না।

২৭. নাকে ঔষধ দেয়া : নাকে পানি বা ঔষধ দিলে যদি তা খাদ্য নালীতে চলে যায়, তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে এবং কাযা করতে হবে। (ফতওয়া রাহমানিয়া)

২৮. চোখে ঔষধ বা সুরমা ব্যবহার করা : চোখে ঔষধ বা সুরমা ব্যবহার করার দ্বারা রোজা ভাঙ্গবে না। যদিও এগুলোর স্বাদ গলায় অনুভব হয়। (হেদায়া)

২৯. কানে ঔষধ প্রদান করা : কানে ঔষধ, তেল ইত্যাদি ঢুকালে রোযা ভাঙ্গবে না।

৩০. নকল দাঁত মুখে রাখা: রোজা রেখে নকল দাঁত মুখে স্থাপন করে রাখলে রোজার কোন ক্ষতি হয় না। (ইমদাদুল ফতওয়া)

৩১. হিজামা বা সিংগা বা cupping এ রোযা ভাংগে না। যদি শরীর দুর্বল লাগার ভয় বা সম্ভাবনা থাকে তাহলে মাকরুহ। যদি এমন ভয় বা সম্ভাবনা না থাকে তাহলে মাকরুহ না।

Tuesday, November 6, 2018

মহিলাদের সাথে মুসাফাহার বিধান (আল্লামা শাহ্ আহদ শফি সম্পর্কে অপপ্রচারের জবাব))

মহিলাদের সাথে মুসাফাহার বিধান (আল্লামা শাহ্ আহদ শফি সম্পর্কে অপপ্রচারের জবাব))

১. মহিলা যুবতি হলে তার সাথে মুসাফাহা করা হারাম নাজায়েয। এ ব্যাপারে সব মাযহাবের হুকুম এক ও অভিন্ন। 

২. যদি একজন বয়োবৃদ্ধ হয় আর অপরজন যুবক বা যুবতি তাহলে হানাফি মাযহাব মতে মুসাফাহা করলে সমস্যা নেই। তবে শর্ত হলো কোনো ধরনের অঘটন ঘটবে না বলে পুরোপুরি আশঙ্কা মুক্ত হতে হবে। এ আশঙ্কা মুক্তর বড় স্থান হলো জনসম্মুখে হওয়া। 

৩.আর যদি মহিলা ও পুরুষ উভয়জন বয়স্ক হন, অর্থাৎ পুরুষ শায়খে ফানীর কাতারে পৌঁছে যান আর মহিলা সান্নে আয়াসে উপনীত হয়ে পড়েন,  তাহলে তারা উভয়ে মুসাফহা করলে কোনো অসুবিধা নেই।  হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি. বুড়ি মহিলার সাথে মুসাফাহা করতেন। দেখুন..... বাদায়েউস সানায়ে ৪/২৯৩, ৫/১২৩। বাহরুর রায়েক ৮/২১৮-২১৯। তুহফাতুল মুলূক ৩/৩৩৩-৩৩৪।

সুতরাং আল্লামা আহমদ শফী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুসাফাহার বিষয়টি মাসআলার এই তৃতীয় শাখার সাথে সম্পৃক্ত। যা শরীয়তে বৈধ। 

কিন্তু জাহেলরা না জেনে না বুঝে শুধু বকওয়াসী করছে।

Monday, September 11, 2017

মৃত ব্যক্তির জন্য তিনদিনা সাতদিনা ও চল্লিশা পালন করা প্রসঙ্গে।

মৃত ব্যক্তির জন্য তিনদিনা সাতদিনা ও চল্লিশা পালন করা প্রসঙ্গে।

কেউ মারা গেলে মৃতের বাড়িতে প্রথা পালন করে তিনদিনের দিন বা সাতদিনের দিন অথবা চল্লিশ দিনের দিন দাওয়াতের আয়োজন করা--যাকে যথাক্রমে তিনদিনা, সাতদিনা ও চল্লিশা বলে, শরীয়তের দৃষ্টিতে এ প্রথা পালন করা নাজায়িয ও বিদ‘আত। এসব পালন করার কোন অবকাশ নেই।

সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর যুগে একে নিষিদ্ধ ও মন্দ কাজ গণ্য করা হত। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, “আমরা মৃতের দাফন কার্য শেষ হওয়ার পর তার বাড়িতে একত্রিত হওয়া এবং (দাফনে শরীক লোকজন ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য) খাবারের আয়োজন করাকে নিয়াহা (নিষিদ্ধ পন্থায় শোক পালন)-এর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করতাম।”
(মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৬৯০৫)

বস্তুত দাওয়াতের আয়োজন তো করা হয় কোনো আনন্দ-উৎসবের সময়, কোনো বেদনা বা শোকের মুহূর্তে নয়। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নত হল--মৃতের পরিবার-পরিজনদের জন্য প্রতিবেশীর পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থা করা, যেন তাদেরকে মৃতের জন্য ব্যস্ততা ও শোকাহত থাকার কারণে অনাহারে থাকতে না হয়। অথচ উল্লিখিত কাজটি এর সম্পূর্ণ উল্টো ও বিপরীত। তাই এর থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

আর যদি মৃত ব্যক্তির জন্য ছাওয়াব রেসানী হিসেবে খাওয়ানো হয়, তাহলে তিনদিন বা সাতদিন কিংবা চল্লিশ দিনের নিয়ম করা যাবে না, বরং ঈসালে ছাওয়াবের জন্য সেভাবে প্রথাগত নির্দিষ্ট দিনের নিয়ম পালন না করে যে কোন দিন তা করা যায়। আর যেহেতু তখন তা মৃত ব্যক্তির রুহে ছাওয়াবের পৌঁছানোর জন্য সদকার হুকুমে হবে, তাই শুধু কেবল গরীব ও ফকীর-মিসকীনদেরকে খাওয়াতে হবে। সেই সদকার খাবার ধনীদেরকে খাওয়ানো যাবে না। এতব্যতীত মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ যাতে কোন নাবালগ শরীক আছে বা ওয়ারিসদের সবার অনুমতি নেয়া হয়নি  সেখান থেকে খরচ করা যাবে না। বরং তার আত্মীয়গণ নিজেদের অর্থ-সম্পদ দ্বারা তার জন্য গরীব-মিসকীনদের খাওয়ানো বা দান করার মাধ্যম ঈসালে ছাওয়াব করবেন।

(প্রমাণ : সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৬১২; ফাতহুল কাদীর, ২য় খণ্ড, ১০২ পৃষ্ঠা; রদ্দুল মুহতার, ২য় খণ্ড, ২৪০ পৃষ্ঠা/ ইলাউস সুনান, ৮ম খণ্ড, ৩২৯ পৃষ্ঠা)

Saturday, August 19, 2017

ওযুর ফরয ও সুন্নাত ও ওযু ভঙ্গের করণ সম্পর্কেত মাসায়েল সূমহ

ওযুর ফরয ও সুন্নাত ও ওযু ভঙ্গের করণ সম্পর্কেত মাসায়েল সূমহ

ওযুর ফরয কয়টি ও কি কি?

ওযুর ফরয হচ্ছে চারটি।
যথা-
১.কপালে চুলের গোড়া থেকে থুতনির নিচ পর্যন্ত এক কানের লতি থেকে অপর কানের লতি পর্যন্ত সমস্ত মুখমন্ডল ধৌত করা।
২.উভয় হাত কনুইসহ ধৌত করা।
৩.মাথার চার ভাগের এক ভাগ মাসেহ করা।
৪.উভয় পা টাখনুসহ ধৌত করা।
উল্লেখ্য, যদি দাড়ি ঘন হয় দাড়ির নিচে পানি পোওছানো ফরয নয়,আর যদি চার অঙ্গের কোন একটি নখ পরিমাণও শুষ্ক ধাকে উযু সহিহ হবে না।

ওযু করার সুন্নাত তরিকা
১.উভয় হাত কব্জি সহ তিনবার ধৌত করা।
২.বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম বলা()
৩.তিনবার কুলি করা।
৪.মিসওয়াক করা।
৫.তিনবার নাকে পনি দেয়া ও নাক ঝারা।
৬.সমস্ত মুখমন্ডল তিনবার ধৌত করা।
৭.তিনবার উভয় হাত কনুইসহ ধৌত করা।
৮.সমস্ত মাথা একবার মাসের করা এবং মাথার সঙ্গে কানও মাসের করা।
৯.উভয় পা টাখনুসহ তিনবার ধৌত করা।

ওযু সম্পর্কেত মাসায়েল সূমহ

মোজার উপর মাসের করার হুকুম!
পূর্ণ পবিত্রতার পর মোজা পরিধান করলে ওযু নষ্ট হওয়া পর থেকে মুকিম ব্যাক্তির জন্য একদিন একরাত এবং মুসাফির ব্যাক্তির জন্য তিনদিন দিনরাত ঐ মোজার উপর মাসেহ করা জায়েজ। পা থেকে মোজা খলবে না বরং মোজার উপর মাসেহ করবে।

মোজার উপর মাসাহ বরার ফরয ও সুন্নাত
পায়ের উপরে ভাগ দ্যর্ঘ্যে তিন আঙ্গুল পরিমার মোজার উপর মাসাহ করা ফরয। আর বাম হাতের পাচঁ আঙ্গুল দ্বরা পায়ের আঙ্গুলের মাথা থেকে পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত টেনে আনা সুন্নাত।

ওযুর মাকরূহ সমুহ

১. অযুর সুন্নত সমুহের যে কোন সুন্নত ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে অযু মাকরূহ হবে।
২. প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যয় করা।
৩. মুখমন্ডল ধৌত করার সময় সজোরে মুখে পানি নিক্ষেপ করা।
৪. বিনা ওজরে বাম হাত দ্বারা কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়ার এবং ডান হাতে নাক পরিস্কার করা।
৫. অপবিত্র স্থানে অযু করা।
৬,. মসজিদের মধ্যে অযু করা,তবে কোন পাত্রের মধ্যে অযু করা জায়েয।
৭. কফ্‌কাশী বা নাকের ময়লা অযুর পানির মধ্যে নিক্ষেপ করা।
৮. বিনা কারনে অন্যের সাহায্য নেওয়া।

অযুর প্রকারবেদঃ-অযু পাঁচ প্রকার ফরজ,ওয়াজিব,সুন্নত,মাকরূহ ও হারাম ওযু।

১. সকল প্রকার নামায পড়া ও কোরআন শরীফ তেলয়াতের জন্য এবং সেজদার তেলয়াতের জন্য অজু করা ফরজ।
২. কাবা শরীফ তওয়াফ করার জন্য ওয়াজিব।
৩. মোস্তাহাব বা সুন্নত ওযু হলো যা শরীর পাক রাখার জন্য করা হয় অর্থাৎ সব সময় ওজু রাখা সুন্নত।
৪. অযু করে কোন ইবাদত না করে সেই অযু থাকা অবস্থায় নতুন অযু করা মাকরূহ।
৫. হারাম অযু হলো কারো মালিকাধীন পানি জোরপুর্বক নিয়ে কিংবা ইয়াতীমের সংরক্ষিত পানি দিয়ে অযু করা হারাম।

ওযু ভঙ্গের করণ সূমহ
১.প্রসাব বা পায়খানার রাস্তা দিয়ে কোন কিছু বাহির হওয়া।
২.শরিরের কোন অঙ্গ হতে প্রভাহমান নাপাক বের হয়ে এমন স্থানে গড়িয়ে পরা যেমন স্থানে ওযু ও গোসলে ধৌত করা ফরয।
৩.মুখ ভরে বমি করা, চাই তা পানি, খাদ্য বা পিত্ত হোক কিংবা জমাট রক্ত।
৪. থুথুর সঙ্গে রক্ত বিরিয়ে রক্ত যদি থুথুকে লাল বর্ণ করে দেয়।
৫.চিত বা কাত হয়ে এমন বস্তুর সঙ্গে  হেলান দিয়ে গুম যাওয়া, যা সরিয়ে নিলে লোকটি পরে যাবে।
৬.পাগল বা মাতাল ও বেহুশ হয়ে গেলে সর্বস্থায় অযু ভঙ্গ হয়ে যায়।
৭.প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ রুকু সিজদাহ বিশিষ্ঠ নামাযে অট্টহাসি হাসা।

Monday, July 10, 2017

সহীহ হাদিস আছারে সাহাবা ও যোগশ্রেষ্ঠ ফকিহ্দের দৃষ্টিতে নারীদের নামাজের উত্তম স্থান।

সহীহ হাদিস আছারে সাহাবা ও যোগশ্রেষ্ঠ ফকিহ্দের দৃষ্টিতে নারীদের নামাজের উত্তম স্থান।

ইদানীং দেখা যাচ্ছে, নারীরা অধিক সওয়াবের আশায় মসজিদে-ঈদগাহে ছুটে চলছেন। অথচ নারীদের ওপর ঈদ ও জুমার নামাজ কোনোটাই ওয়াজিব নয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্যও নারীদের মসজিদে না গিয়ে ঘরে পড়লেই বেশি সওয়াব। তাঁদের জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য ঘর থেকে বের হওয়া শরিয়ত অনুমোদিত নয়। পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অসংখ্য হাদিসে নারীদের পর্দা করার অত্যধিক তাগিদ করা হয়েছে। সেসব আয়াত ও হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যত দূর সম্ভব নারীদের নিজ গৃহে অবস্থান জরুরি। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলি যুগের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন কোরো না। তোমরা সালাত কায়েম করো, জাকাত প্রদান করো এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো। ’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৩)

নারীদের মসজিদে আসার প্রতি রাসুল (সা.)-এর নিরুৎসাহ প্রদান

নারীদের নামাজসংক্রান্ত অসংখ্য হাদিস আছে, যেগুলোতে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঘরে নামাজ পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের মসজিদে আসতে নিরুৎসাহী করা হয়েছে।

এক. হজরত আবদুল্লাহ (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ক্ষুদ্র কক্ষে নারীদের নামাজ বড় কামরার নামাজের তুলনায় উত্তম। ঘরের নির্জন কোণে নামাজ ক্ষুদ্র কক্ষের নামাজের তুলনায় উত্তম। ’ [আবু দাউদ, হাদিস : ৫৭০ (হাদিসটি সহিহ)]

অন্য বর্ণনায় হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নারীদের ঘরে নামাজ পড়া ঘরের বাইরে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। ’ (আল মু’জামুল আওসাত, হাদিস : ৯১০১)

দুই. উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নারীদের নামাজের উত্তম জায়গা হলো তাদের ঘরের নির্জন কোণ। [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৬৫৪২ (হাদিসটি হাসান)]

তিন. আবু হুমাইদ আল সাঈদি থেকে বর্ণিত, একবার উম্মে হুমাইদ নামক একজন মহিলা সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে আগ্রহী। ’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমি জানি তুমি আমার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পছন্দ করো। কিন্তু তোমার জন্য বড় কামরার তুলনায় গৃহের অন্দরমহলে নামাজ পড়া উত্তম। আবার বড় কামরায় নামাজ পড়া উত্তম বারান্দায় নামাজ পড়ার চেয়ে। বারান্দায় নামাজ আদায় করা উত্তম তোমার মহল্লার মসজিদের চেয়ে। মহল্লার মসজিদ উত্তম আমার মসজিদ (মসজিদে নববী) থেকে। ’ এ কথা শোনার পর উম্মে হুমাইদ (রা.) তাঁর গৃহের নির্জন স্থানে একটি নামাজের স্থান বানাতে নির্দেশ দিলেন। সেখানেই আজীবন নামাজ আদায় করতে লাগলেন। এ অবস্থায় তিনি ইন্তিকাল করেন। [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৭০৯০; সহিহ ইবনে খুজাইমা, হাদিস : ১৬৮৯ {হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.)-এর মতে, হাদিসটি হাসান। ফাতহুল বারি : ২/২৯০}]

চার. যেসব পুরুষ প্রয়োজন ছাড়া মসজিদে না এসে ঘরে নামাজ পড়ে, তাদের বিষয়ে রাগান্বিত হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি ঘরগুলোতে নারী ও শিশুরা না থাকত, তাহলে আমি এশার নামাজের ইমামতির দায়িত্ব অন্যজনকে দিয়ে কিছু যুবকদল দিয়ে তাদের ঘরের সব কিছু জ্বালিয়ে দিতাম। ’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৮৭৯৬)

এতে বোঝা যায়, যখন নামাজের জামাত চলতে থাকে, তখন নারীরা ঘরে থাকে।

পাঁচ. আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘জামাতে জুমার নামাজ পড়া প্রত্যেক মুসলমানের ওপর অকাট্য ওয়াজিব, তবে ক্রীতদাস, নারী, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব নয়। ’ [আবু দাউদ, হাদিস : ১০৬৭ (হাদিসটি ইমাম বুখারি ও মুসলিম (রহ.)-এর শর্ত অনুযায়ী সহিহ)। আল মুস্তাদরাক : ১/২৮৮]

ছয়. হজরত মুহাম্মদ ইবনে কাব আল কুরাজি (রহ.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘নারী ও দাসের ওপর জুমার নামাজ নাই। ’ [মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫১৯৬ (হাদিসটি সহিহ)]

উল্লিখিত হাদিসগুলো থেকে এ বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে যায়—এক. পুরুষদের দায়িত্ব পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে পড়া, আর মহিলাদের দায়িত্ব হলো ঘরে নামাজ পড়া। দুই. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মহিলাদের জন্য জামাতে শরিক হওয়া ওয়াজিব, সুন্নাত বা অত্যাবশ্যকীয় ছিল না; বরং শুধু অনুমতি ছিল। তবে সেটিও এমন, অপছন্দের সঙ্গে ও শর্তসাপেক্ষ ছিল।

তিন. হজরত উম্মে হুমাইদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথার ওপর আমল করার জন্যই মসজিদ ছেড়ে সারা জীবন বাড়ির নির্জন কক্ষে নামাজ আদায় করেছেন। সে যুগের নারীরা সাধারণত এটাই করতেন। চার. সে যুগের পরিবেশ ভালো ছিল, এ জন্যই কেবল মহিলাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। নচেৎ রাসুল (সা.)-ই কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করতেন।

কঠোর শর্ত সাপেক্ষে নারীদের মসজিদে আসার অনুমতি

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মহিলাদের যে মসজিদে আসার অনুমতি ছিল, তা-ও অনেক শর্তসাপেক্ষ ছিল। যথা—(ক) সম্পূর্ণ আবৃত ও পূর্ণ শরীর ঢেকে বের হবে। (খ) সেজেগুজে খুশবু লাগিয়ে বের না হওয়া। (গ) বাজনাদার অলংকার, চুড়ি ইত্যাদি পরে আসতে পারবে না। (ঘ) অঙ্গভঙ্গি করে চলতে পারবে না। (ঙ) পুরুষদের ভিড় এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলবে। (চ) অপ্রয়োজনে কোনো বেগানা পুরুষের সঙ্গে কথা বলবে না। সর্বোপরি তাদের এই বের হওয়া ফিতনার কারণ হবে না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৫৬৫, আহকামুল কোরআন, থানভি : ৩/৪৭১, বাজলুল মাজহুদ : ৪/১৬১)

কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিদায়ের কিছুদিন পর থেকেই যখন এই শর্তগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে শুরু করে, তখন রাসুল (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় সাহাবিরা তা উপলব্ধি করতে পেরে নারীদের মসজিদে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

নারীদের মসজিদে আসার ব্যাপারে সাহাবিদের নিষেধাজ্ঞা

সাহাবায়ে কেরাম থেকে রাসুল (সা.)-এর আদর্শবিরোধী কোনো কাজ প্রকাশ পাবে—সেটা কল্পনাও করা যায় না। তাই হাদিস শরিফের পাশাপাশি সাহাবিদের আমলও দলিলরূপে গণ্য। কেননা তাঁরা ছিলেন সত্যের মাপকাঠি। রাসুল (সা.) সুস্পষ্ট বলেছেন, ‘তোমরা আমার পরে  খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, যেমন মাড়ির দাঁত দিয়ে কোনো জিনিস মজবুতভাবে ধরা হয়। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬০৭)

হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজ খেলাফত আমলে যখন মহিলাদের পরিবর্তিত অবস্থা দেখেন এবং ফিতনার আশঙ্কাও দিন দিন বাড়তে থাকে, তখন উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.), ইবনে মাসউদ ও ইবনুজ জুবায়ের (রা.)সহ বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম নারীদের মসজিদে না আসার আদেশ জারি করলেন। অন্য সাহাবায়ে কেরামও এ ঘোষণাকে স্বাগত জানালেন। কেননা তাঁরা জানতেন যে মহিলাদের মসজিদে আসতে নিষেধ করার মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশের বিরোধিতা করা হয়নি; বরং তাঁর ইচ্ছারই প্রতিফলন হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের পক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো হুকুমের বিরোধিতা করার কল্পনাও করা যায় না। তা সত্ত্বেও তাঁরা এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এ জন্যই যে যেসব শর্তের সঙ্গে নারীদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি ছিল, এখন সেসব শর্ত হারিয়ে যাচ্ছে।

নারীদের মসজিদে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞায় সাহাবিদের যেসব উক্তি বর্ণিত হয়েছে, এর আংশিক নিম্নে উল্লেখ করা হলো—

এক. হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নারীরা যে অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তা যদি রাসুল (সা.) জানতেন, তবে বনি ইসরাইলের নারীদের যেমন নিষেধ করা হয়েছিল, তেমনি তাদেরও মসজিদে আসা নিষেধ করে দিতেন। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৬৯)

বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘আয়েশা (রা.)-এর এই মন্তব্য তো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুনিয়া থেকে বিদায়ের কিছুদিন পরের নারীদের সম্পর্কে। অথচ আজকের যুগের নারীদের উগ্রতা আর বেহায়াপনার হাজার ভাগের এক ভাগও সে যুগে ছিল না। তাহলে এ অবস্থা দেখে তিনি কী মন্তব্য করতেন?’ (উমদাতুল কারি : ৬/১৫৮)

এখন আমরা চিন্তা করে দেখতে পারি যে আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) নিজ যুগ তথা হিজরি নবম শতাব্দীর নারীদের সম্পর্কে এ কথা বলেছেন। তাহলে আজ হিজরি পঞ্চদশ শতাব্দীতে সারা বিশ্ব যে অশ্লীলতা আর উলঙ্গপনার দিকে ছুটে চলেছে, বেপর্দা আর বেহায়াপনার আজ যে ছড়াছড়ি, মেয়েরা যখন পুরুষের পোশাক পরছে, পেট-পিঠ খুলে রাস্তাঘাটে বেড়াচ্ছে, ঠিক সে মুহূর্তে অবলা মা-বোনদের সওয়াবের স্বপ্ন দেখিয়ে মসজিদে আর ঈদগাহে টেনে আনার অপচেষ্টা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। অথচ এর জন্য দলিল দেওয়া হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের নারীদের দ্বারা। এ যুগের নারীরা কি সে যুগের নারীদের মতো? কস্মিনকালেও নয়। তা সত্ত্বেও সে যুগেই নারীদের মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তাহলে কিভাবে এ যুগের নারীদের মসজিদে ও ঈদগাহে গিয়ে নামাজের জন্য উৎসাহ দেওয়া যায়?

দুই. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, ‘ওমর (রা.)-এর এক স্ত্রী (আতেকা বিনতে জায়েদ) ফজর ও এশার নামাজে জামাতের জন্য মসজিদে যেতেন। তাঁকে বলা হলো, ‘আপনি কেন নামাজের জন্য বের হন? অথচ আপনি জানেন যে হজরত ওমর (রা.) তা অপছন্দ করতেন ও আত্মমর্যাদাবোধের পরিপন্থী মনে করেন?’ তখন তিনি বললেন, ‘তাহলে ওমর কেন আমাকে সরাসরি নিষেধ করেন না?’ তখন বলা হলো যে রাসুল (সা.)-এর বাণী রয়েছে—তোমরা আল্লাহর বান্দিদের আল্লাহর মসজিদ থেকে নিষেধ কোরো না—এ কথার কারণে তিনি সরাসরি নিষেধও করছেন না। ’ ’’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯০০)

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, স্ত্রী আতেকা বিবাহের সময় ওমর (রা.)-কে মসজিদে নববীতে গিয়ে নামাজের অনুমতি দেওয়ার শর্ত করেছিলেন, এ জন্য ওমর (রা.) অপছন্দ সত্যেও স্ত্রীকে নিষেধ করতে পারছিলেন না। (আল ইসাবাহ : ৮/২২৮)

তিন. আবু আমর শায়বানি (রহ.) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে দেখেছি, তিনি জুমার দিন নারীদের মসজিদ থেকে বের করে দিতেন এবং বলতেন, আপনারা বের হয়ে যান। আপনাদের ঘরই আপনাদের জন্য উত্তম। (আল মু’জামুল কাবির, হাদিস : ৯৪৭৫) আল্লামা হাইসামি (রহ.) বলেন, এ হাদিসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য (সেকা)। (মাজমাউজ জাওয়াইদ : ২/৩৫)

চার. হজরত জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) তাঁর পরিবারের কোনো নারীকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজে যেতে দিতেন না। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৫৮৪৬ (হাদিসটি সহিহ)]

পাঁচ. হজরত ইবনে ওমর (রা.) তাঁর স্ত্রীদের ঈদগাহে বের হতে দিতেন না। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৫৮৪৫ (হাদিসটি সহিহ)]

নারীদের মসজিদে গমন নিয়ে ফিকাহবিদদের মতামত : প্রথমদিকের কিছু ওলামায়ে কেরাম বৃদ্ধাদের জন্য মাগরিব ও এশার সময় ফিতনামুক্ত হওয়ার কারণে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। পরবর্তী ফিকাহবিদরা ফিতনার ব্যাপকতার কারণে যুবতী ও বৃদ্ধা সবার জন্য সব নামাজে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন। (শরহুস সগির : ১/৪৪৬, আল মাজমু : ৪/১৯৮, আল মুগনি :  ২/১৯৩)

হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাদায়েউস সানায়ে’তে বলা হয়েছে যে যুবতী নারীদের মসজিদে যাওয়া ফিতনা। (বাদায়েউস সানায়ে : ১/১৫৬)

আল্লামা ইবনে নুজাইম মিসরি ও আল্লামা হাসকাফি (রহ.) বলেন, বর্তমান যুগে ফিতনার ব্যাপক প্রচলন হওয়ায় ফতোয়া হলো, সব নারীর জন্যই সব নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাতে আদায় করা মাকরুহে তাহরিমি। (আল বাহরুর রায়েক : ১/৬২৭-৬২৮, আদ্দুররুল মুখতার : ১/৩৮০)

নারীদের মসজিদে যাওয়া সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যা

এক. হজরত ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর বান্দিদের আল্লাহর মসজিদ থেকে নিষেধ কোরো না। ’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ৪৪২; আবু দাউদ, হাদিস : ৫৬৬)

উল্লিখিত হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, ইসলামের প্রথম যুগে নারীরা মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাদের নিষেধ করা হতো না। ওই নির্দেশ সাময়িক ও শর্তসাপেক্ষ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের কারণে ও শর্ত না পাওয়ার কারণে এখন নিষেধ করাটাই সুন্নত। কারণ রাসুল (সা.)-এর যুগ ওহি নাজিলের যুগ ছিল। তাই নারীরা যাতে বিভিন্ন সময় অবতীর্ণ আয়াত ও শরিয়তের বিভিন্ন বিধান সরাসরি রাসুল (সা.) থেকে ভালোভাবে শিখে নিতে পারেন, সে জন্য নারীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করা হয়নি। কিন্তু পরে এই প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম নিষেধ করে দেন।

আল্লামা ইবনে হাজর (রহ.) বলেন, এ হাদিসে যদিও স্বামীকে নিষেধ করতে বারণ করা হয়েছে, এ বারণ কঠোর নিষেধ নয়, বরং তা হলো সাধারণ নিষেধ। এ জন্যই স্বামী অনুমতি দিলেও ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান ফিতনার আশঙ্কায় নারীদের মসজিদে আসা নিষেধ করতে পারবেন। (মিরকাতুল মাফাতিহ : ৩/৮৩৬)

দুই. নারীদের মসজিদে যাওয়া সম্পর্কে দ্বিতীয় হাদিস হলো, উম্মে আতিয়া (রা.) বলেন, আমাদের আদেশ করা হয়েছে যে আমরা যেন ঋতুবতী পর্দানশিন নারীদেরও ঈদের ময়দানে নিয়ে যাই। যাতে তাঁরা মুসলমানদের জামাত ও দোয়ায় শরিক থাকতে পারেন। তবে ঋতুবতী নারীরা নামাজের জায়গা থেকে আলাদা থাকবে। জনৈকা সাহাবিয়া বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের অনেকের তো চাদরও নেই। রাসুল (সা.) বললেন, তাকে যেন তার বান্ধবী নিজ চাদর দিয়ে সাহায্য করে। (বুখারি শরিফ, হাদিস : ৯৭৪)

ব্যাখ্যা : এখানেও আগের উত্তরটি প্রযোজ্য। আর তা হলো, নারীরা যাতে ঈদের দিনের যাবতীয় শরয়ি বিধান সরাসরি রাসুল (সা.) থেকে ও রাসুলের ঈদের খুতবায় যাবতীয় ওয়াজ-নসিহত ও মাসয়ালা-মাসায়েল ভালোভাবে শিখে নিতে পারে, সে জন্য রাসুল (সা.)-এর যুগে ঈদগাহে আসার অনুমতি ছিল। কিন্তু পরে এই প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম নিষেধ করে দেন।

ইমাম তাহাবি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীদের জন্য ঈদগাহে যাওয়ার অনুমতি ছিল, যাতে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি দেখা যায়। মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য দেখে ইসলামের দুশমনদের যেন চক্ষুশূল হয়। কিন্তু আজ যেহেতু সেই পরিস্থিতি নেই এবং সংখ্যাধিক্য দেখানোর জন্য পুরুষরাই যথেষ্ট, তাই ওই বিধানও প্রযোজ্য হবে না। (ফাতহুল বারি : ২/৪৭০)

আল্লামা ইবনুল হাজ মালেকি (রহ.) হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিধানটি রাসুল (সা.)-এর যুগের বৈশিষ্ট্য। পরবর্তী যুগের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। (আল মাদখাল : ২/২৮৮)

দুটি সন্দেহ ও তার নিরসন

সন্দেহ এক. কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, যদি বর্তমান যুগে নারীদের মসজিদে যাওয়া ফিতনার আশঙ্কায় নিষেধ হয়, তাহলে রাসুল (সা.) স্পষ্ট এ কথা বলে যাননি কেন যে আমার যুগের পর নারীদের মসজিদে আসা নিষেধ?

নিরসন : রাসুল (সা.) শরিয়তের অসংখ্য বিধানাবলির ক্ষেত্রেই এরূপ করে গিয়েছেন যে তা স্পষ্ট করে বলে যাননি। তিনি জানতেন ও বুঝতেন যে প্রিয় সাহাবি তাঁর সব কথার মর্ম ও উদ্দেশ্য বুঝেই পরবর্তী সময়ে আমল করবেন। তাই সব কথা স্পষ্ট করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। যেমন—রাসুল (সা.)-এর পর আবু বকর (রা.)-কে খলিফা বানানোর কথা স্পষ্ট বলে যাননি। কেননা তিনি জানতেন যে তাঁর সাহাবিরা বিভিন্ন আকার-ইঙ্গিতে তাঁর উদ্দেশ্য বুঝে নিয়েছেন। এখন আর তাদের তা স্পষ্ট করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের আলোচিত বিষয়টিও তদ্রূপ। নারীদের ফিতনা ও নারীদের পর্দা-সংক্রান্ত শত শত হাদিস থাকা সত্ত্বেও সাহাবিরা এ বিষয়ে রাসুল (সা.)-এর ইচ্ছা বুঝবেন না, তা অসম্ভব। 

সন্দেহ দুই, অনেক ভাই বলে থাকেন যে মক্কা-মদিনার হারামাইন শরিফে নারীরা মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ করে থাকেন।

নিরসন : আসলে হারামাইনে কিছু বিশেষ প্রয়োজনের কারণে নারীদের জামাতে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তা হলো, নারীদের যেহেতু মক্কার মসজিদে হারামে তাওয়াফের জন্য আসতে হয় এবং মদিনার মসজিদে নববিতে জিয়ারতের জন্য তাঁরা এসে থাকেন। এ অবস্থায় নামাজের আজান হয়ে গেলে আর বের না হয়ে তাঁরা মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ করে থাকেন। ওলামায়ে কেরাম এর অনুমতি দিয়েছেন। তবে শুধু কেবল জামাতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নারীদের হারামাইনে যাওয়ার অনুমতি নেই। বর্তমানে না জেনে অনেক মহিলা শুধু নামাজের জন্যই হারামাইনে উপস্থিত হয়ে থাকেন, তা ঠিক নয়। (ইলাউস সুনান : ৪/২৩১)

উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, বর্তমানে নারীদের মসজিদে আসার স্লোগান এটি মূলত নামাযীদের মনে খারাবী সৃষ্টির ষড়যন্ত্র। যা ইহুদী খৃষ্টানদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের নীল নকশা। মানুষকে ধোকা দেয়ার জন্য যে নোংরামীর গায়ে লেবেল লাগানো হয়েছে দ্বীন আর বঞ্চিত হবার মুখরোচক স্লোগান।

আল্লাহ তাআলা আমাদের এ ফিতনাবাজ কথিত আহলে হাদীসদের ধোকা থেকে মুসলিম উম্মাহকে হিফাযত করুন। আমীন।